
মাহেশ, বল্লভপুর ঘুরে এবার গন্তব্য শ্রীরামপুরের মূল শহর।
এবার আমাদের গন্তব্য দে স্ট্রীট। প্রথমেই যাব দে বাড়িতে। ঠাকুরদালান সম্বলিত এই বাড়ি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো আর এখানকার দূর্গাপুজোও খুব বিখ্যাত। হুগলি জেলার বনেদী বাড়ির পুজোর লিস্ট করতে বসলে দে বাড়ির পুজোকে বাদ দেওয়া যাবে না। কাছেই দে ঘাট - দে পরিবার নিজেদের জন্য বানালেও এখন সবার জন্যই খোলা। এই ঘাটে এখন বেশ কিছু ছোট মন্দির দেখতে পাওয়া যায় - করুণাময়ী কালীমাতা, চৌরঙ্গী বাবা এবং দূর্গামাতার মন্দির।
দে বাড়িকে অনেকেই জমিদারবাড়ি বলে ভুল করে, কিন্তু এঁনারা ছিলেন মূলত কলকাতার বড়বাজারের লবণ ব্যবসায়ী। শ্রীজ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের 'বংশ-পরিচয়' (২য় খণ্ড) (প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি, ১৯২২) থেকে জানা যায় যে ষোড়শ শতকের শুরুতে কলকাতা-সংলগ্ন দমদমার কাছে গীতী নামক গ্রামে এই বংশের আদি বাসস্থান ছিল, পরে শ্রীরামপুরের কাছে রিষিড়া গ্রামে চলে আসেন। মোটামুটি ১৭০০ এর শুরুতে এই বংশের পূর্ব-পুরুষ রামভদ্র দে ব্যবসা উপলক্ষে শ্রীরামপুরে স্থিতু হন। ১৭৪৮ সালে (বা ১৭৫০ সাল) দে পরিবারের দুর্গাপুজোর শুরু হয় রামভদ্র দে-র হাত ধরে।
রামভদ্র দে'র শুরুতে একটি মুদির দোকান ছিল। পরে তাঁর পুত্র সাফলীরাম দে তুলার ব্যবসা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে ড্যানিশ কোম্পানীর সাথে বিভিন্ন পণ্যের আমদানি-রফতানির কাজও শুরু করেন।
সাফলীরামের জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন রামচন্দ্র দে (১৭৬৩-১৮২৩)। বাবার সামান্য ব্যবসায়ে তিনি তেমন উন্নতির সুযোগ না দেখে চলে আসেন কলকাতায়। এখানে তাঁদের কোন আত্মীয়ের লবণের ব্যবসা ছিল হাটখোলাতে (আজকের শোভাবাজার-কুমারটুলি অঞ্চল), সেখানে রামচন্দ্র হাত পাকান। আস্তে আস্তে হাটখোলার সব মহাজনের কাছেই তাঁর ব্যবসায়িক বুদ্ধির কদর মেলে। রানাঘাটের পাল চৌধুরী পরিবারের সাহায্যে এক সময় রামচন্দ্র হাটখোলাতেই নিজের ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার উন্নতির সাথে সাথে রামচন্দ্রের লবণের কারবার ছড়িয়ে পরেছিল মুর্শিদাবাদ, ভগবানগোলা, কালনা-কাটোয়া, ভদ্রেশ্বর, গৌরহাটি, মেদিনীপুর ঘাটাল ও আমতা ইত্যাদি জায়গায়।
রামচন্দ্র দে এবং তাঁর ছেলে কর্মবীর রাজকৃষ্ণ দের আমলে দে পরিবারে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভূত উন্নতি হয় এবং সাথে সাথে দে বাড়িতে দুর্গাপূজার জৌলুশও বাড়তে থাকে। রামচন্দ্রের আমলেই এই প্রাসাদোপম 'দে বাড়ী' টি তৈরি হয়। রাজকীয় সম্মান হিসবে শ্রীরামপুরের ড্যানিশ প্রধান রামচন্দ্রকে এমন অধিকার দেন যে তাঁর গাড়ির সামনে দিয়ে চোপদাররা রূপোর দণ্ড হাতে নিয়ে কুচকাওয়াজ করে যেতে পারত। ড্যানিশ কর্তারা যখন হাসপাতাল খোলার কথা বলেন দয়াশীল রামচন্দ্র মুক্তহস্তে দান করেছিলেন - এটিই আজকের ওয়ালশ হাসপাতাল।
পরে দে বাড়ীটি অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। এই পরিবারের লোকজন পরে হাওড়া, হুগলী এবং কলকাতাতে ছড়িয়ে পড়েন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুজোর ক'দিন এই পৈতৃক বাড়িতে সবাই আসেন মনের টানে, মায়ের টানে। একচালার সাবেকি দুর্গাপ্রতিমা দেখতে আসেন বাইরে থেকে বহু মানুষ। দালানে বিভিন্ন রকম সাংকৃতিক অনুষ্ঠানও হয়। দে বাড়ির পুজোদালানে কালীপুজোও হয়।
দে বাড়ির পুজো দালানে ঢুকলেই দেখতে পাবেন এর বিশালত্ব এবং ঠাকুর-মণ্ডপটি। ৬টি সুউচ্চ "করিন্থিয়ান" ধাঁচের স্তম্ভ এই মণ্ডপের ভার বহন করছে, এর পিছনে রোমান আর্চ বিশিষ্ট পাঁচটি খিলান সহ মন্ডপ।
দে'দের কুলদেবতা হলেন শ্রীধর জিউ - তার নিত্যপূজা হয়। দে'দের দুর্গাপূজার শুরু হয় তাই বৈষ্ণব ধর্মমতে, এবং এই পুজোতে কোনরকম বলি হয় না। রাস উৎসবও জাঁকজমকসহ পালিত হয়।
আগেই বলেছি এই পরিবারের জনসংখ্যা ছিল অনেক, ফলে বাড়িটি পরবর্তীকালে বিভিন্ন সময়ে আরো বাড়ানো হয়। অনেকাংশেই দে বাড়ির অবস্থা বেশ খারাপ - ইট বেরিয়ে পড়েছে, গাছ গজিয়েছে দেওয়াল বেয়ে। এই বাড়ির একাংশে ১৯৩৬ সালে 'শ্রীরামপুর ভারতী বালিকা বিদ্যালয়' এবং ভারতী বালিকা প্রাইমারী স্কুল শুরু হয়। আরো এগিয়ে এলে দেখতে পাবেন অন্নদা স্মৃতি ভবন (১৩৪১ বঙ্গাব্দ)।
![]() |
দে বাড়ি - মূল ফটক |
![]() |
ঠাকুরদালান - দে বাড়ী, শ্রীরামপুর |
![]() |
দে বাড়ি |
![]() |
দে বাড়ীর বর্ধিত অংশ |
![]() |
দে বাড়ীর অংশ বিশেষ |
![]() |
দে বাড়ীর অংশ বিশেষ |
![]() |
দে বাড়ীর অংশ বিশেষ |
![]() |
দে বাড়ীর অংশ বিশেষ |
তথ্যসূত্রঃ
https://www.facebook.com/deybari.serampo
https://sumantachatton.blogspot.com/2019/10/blog-post.html
Google Maps - Dey Bari Review
বাংলা সাময়িক পত্রিকা - চতুর্থ পরিচ্ছেদ ১৮৪০-১৮৫৭
No comments:
Post a Comment