শ্রীরামপুরের টি.সি.গোস্বামী ষ্ট্রীটের একটি বাড়ি নিয়ে আগেই লিখেছি - হানা হাউস। এই রাস্তার উপর আরো কয়েকটি পুরোনো বাড়ি আছে।
![]() |
| Home of Bose Family, TC Goswami Street |
35 T.C.Goswami Street-এ আছে বোস পরিবারের পরিত্যক্ত বাড়ি, একদম শ্রীরামপুর ওয়ালশ হাসপাতালের গা ঘেঁষে।
এই বাড়িটির বয়স দেড়শো বছরের বেশি তো হবেই। ৩৭ কাঠার উপর এই ইউরোপীয়ন ভিলা স্টাইলের দোতলা বাড়ির মালিক ছিলেন Mr. D.L. Bose। তাঁর ছেলে স্যামুয়েল বোস খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং শ্রীরামপুরের অনেক সামাজিক কাজের সাথে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে হানা হাউসের বন্ধ হয়ে যাওয়া স্কুলটিকে নিজের চেষ্টায় এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় সংস্কার করে এবং নতুন জমি নিয়ে ১৯২৭ সালে 'শ্রীরামপুর মিশন গালর্স হাইস্কুল' চালু করেন। তাঁর কন্যা কাদম্বরী বোসও উচ্চশিক্ষিত ছিলেন - বাংলার প্রথম মহিলা হিসেবে তিনি ইংল্যাণ্ড গেছিলেন।
এই বাড়িটি নিয়ে লিখেছেন দীপাঞ্জন ঘোষ তাঁর The Concrete Paparazzi ব্লগে। হ্যাঁ ইনিই RJ Deep (of Radio Mirchi), এখন কলকাতা-বাংলার ইতিহাস শোনান Half Pant History-তে। যাই হোক সেখান থেকে এই বাড়ির ব্যাপারে আরো কিছু জানা গেল। এই বাড়ির কিছু ইট 'লাখোরি ইট' দেখতে পাওয়া যায় এবং ১৮২৭ সালের ম্যাপেও এই বাড়িটি ছিল, তাই এই বাড়িটি ড্যানিশ আমলেই তৈরি বলা যায়। কাজেই বাড়িটির বয়স ২০০ বছরের কম বলে মনে হয় না। পরে বোস পরিবারের হাতে এই বাড়িটির সংস্কার, পরিবর্তন এবং পরিবর্ধন হয়েছে বলে মনে হয়।
লাখোরি ইট ব্রিটিশদের আসার আগে বিশেষ করে মোগল আমলে প্রচুর ব্যবহার হত। এই ইটের গঠন 6 x 3 x 0.75-1 ইঞ্চি (যেখানে এখানকার ইটের গঠন 9-10 x 4.25-5 x 2.75-3 ইঞ্চি), অর্থাৎ এখানকার ইটের থেকে পাতলা, ফলে বাঁকানো স্থাপত্যের কাজে সুবিধা হত। এই হাতে বানানো চ্যাপ্টা, পাতলা, লাল পোড়া মাটির ইটগুলি চুন, সুরকি (ইটের গুড়ো), গুড়, বিভিন্ন লতাপাতার রস দিয়ে জোড়া হত। লাখে লাখে এই ইটের অর্ডার করা হত বলে নাকি লাখোরি বা লাখৌরি ইট বলা হয়। পরে ব্রিটিশ আমলে প্রথম বাঙালি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার নীলমণি মিত্র (১৮২৮-১৯০১) এই ইটের মাপে এবং তৈরির ক্ষেত্রে একরকম বদল এনে পুরো ব্যাপারটাকে standardize করেন। বসু বাটি, সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজ এবং মেট্রোপলিটন ইন্সটিটিউট বানানো তাঁরই কীর্তি।
![]() |
| বোস পরিবারের পরিত্যক্ত বাড়ি |
![]() |
| বোস পরিবারের পরিত্যক্ত বাড়ি |
১৯৪৭ থেকে ১৯৭৪ অবধি পৌরসভার রেকর্ড থেকে পাওয়া যায় এখানকার বাসিন্দাদের নাম - Albert, Norman, George, Samuel, Daisy, Steela (Stella?) এবং Grace Bose। এই বোস কিন্তু বাংলার বোস বা বসু-ই। যাই হোক আমার মনে হয় না ১৯৭৪ অবধি এরা কেউ এই বাড়িতে ছিলেন, তার অনেক আগে থেকেই বাড়িটি পড়ে আছে। বেশির ভাগ ছাদ ধসে পড়েছে, দেওয়ালের উপরের পালিশ নষ্ট হয়ে ইট বেড়িয়ে পড়েছে আর গাছপালা চারদিক থেকে গজিয়ে মূল গঠনটিকে দিনদিন আরো নষ্ট করে দিচ্ছে। শ্রীরামপুরের ড্যানিশ হেরিটেজ স্থাপত্যগুলি যখন সংস্কার হয়েছিল তখনও এই বসুবাড়ির দিকে কারো নজর পড়েনি। সম্ভবত এই বাড়িটি ব্যক্তিগত সম্পত্তি হওয়ায় এটির সংস্কার আর হয়নি।
⋙ ⋙ ⋙ ⋙ ⋙
রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে এগিয়ে এলে 51 T.C. Goswami Street -এ আছে আরেকটি বসু-বাড়ি। এই বাড়ির মালিক অবশ্য বি.এল. বসু। ইউরোপীয় ভিলা কায়দায় বানানো এই বাড়িটির বিশেষ ইতিহাস জানা যায় না। বয়স যদিও ১৫০ বছরের বেশি বলেই মনে হয়। সংস্কারের অভাবে এই বাড়িটির অবস্থাও খুব ভাল নয়।
![]() |
| Bose House 2 at 51 TC Goswami Street |
![]() |
| Bose Bari 2 (2016) |
![]() |
| Bose Bari 2 (2024) |
⋙ ⋙ ⋙ ⋙ ⋙ ⋙
এবারে আসি 30 T.C. Goswami Street-এর নাগবাড়ি। প্রথম বোসবাড়ির প্রায় উল্টোদিকে এই বাড়িটির অবস্থান।
এর বর্তমান মালিক রঞ্জিত নাগ এবং অন্যান্যরা। শ্রীরামপুর হেরিটেজ ইনভেন্টরি (২০১৬)-তথ্য অনুযায়ী এই ইউরোপীয় ভিলা স্টাইলের বাড়িটি ১৭৫৫ সালে কিনে কেন বসাক পরিবারের লোকজন। তখন সম্পূর্ণ জায়গাটি প্রায় ৩৩ কাঠা ছিল। তবে পরে বসাকরা এই জমি বিভিন্ন লোককে বিক্রি করে দেয়। এখন এই বাড়িটির অর্ধেক চলে গেছে রিয়াল এস্টেটের হাতে, ফ্ল্যাট হবে।
![]() |
| House of Nag Family, Serampore |
![]() |
| House of Nag Family, Serampore |
মূল বাড়িটিতে বিভিন্ন সংযোজন ও পরিবর্তনের ফলে এর ঐতিহাসিক পরিচিতি ও স্থাপত্যশৈলীগত বৈশিষ্ট্য ক্ষুণ্ণ হয়েছে। বাকি পুরোনো অংশের রক্ষণাবেক্ষণের খুবই অভাব - চারদিকে দেয়ালে গাছ গজিয়েছে।পেছনের দিকে একটি বারান্দা রয়েছে যা হুগলি নদীর দিকে মুখ করা নদীর ঘাট সংলগ্ন।








No comments:
Post a Comment