Pages

Thursday, August 24, 2023

শ্রীরামপুর: টাউন হল

শ্রীরামপুর টাউন হল

শ্রীরামপুর স্টেশনের কাছেই উত্তরের রেলগেটের কাছে অবস্থিত শহরের টাউন হল, অবশ্য পোশাকি নাম রাজা কিশোরীলাল গোস্বামী মেমোরিয়াল হল। আজকে ১ নং এন.এস এভেন্যুউ-এ অবস্থিত বাড়িটি আবার একাধারে শ্রীরামপুর গণগ্রন্থাগার (Shreerampur Public Library) এবং শ্রীরামপুর পৌরসভার অফিসও বটে। এই বাড়িটিতে পৌরসভা পরিচালিত একটি অনুষ্ঠান ঘরও আছে।

পাঠাগার স্থাপনের উদ্দেশ্যেই রাজা কিশোরীলাল গোস্বামী (১৮৫৬-১৯২৩) এই বাড়িটি বানানোর কথা ভাবেন। তবে তাঁর জীবদ্দশায় শ্রীরামপুরের টাউন হল তৈরি হয়নি। ১৯২৭ সালে তাঁর সুযোগ্য পুত্র তুলসী চন্দ্র গোস্বামী এই বাড়িটি প্রায় পুরোটাই নিজের খরচায় বানিয়ে দেন। তখনকার হিসেবে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা লেগেছিল প্রসাদোপম এই বাড়িটি বানাতে। 

এপ্রসঙ্গে আরেকটু পিছনে না গেলে এই টাউন হলের ইতিহাস ভালো করে বোঝা যাবে না। ১৮০৬ সালে ব্রিটিশ ধর্মপ্রচারক উইলিয়ম কেরি এবং ্তাঁর সহকর্মী জশুয়া মার্শম্যানের উদ্যোগে গঠিত হয় শ্রীরামপুর হিতকারিণী সভা - যা ছিল পরবর্তী সময়ে শ্রীরামপুর গণগ্রন্থাগার বা পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিমাত্র। ১৮৪৫ সালে ড্যানিশরা ভারত ছেড়ে চলে গেলে শ্রীরামপুর আসে ব্রিটিশদের অধীনে। ১৮৭১ সালে মহকুমা কর্মকর্তা Traven Plauen একটি প্রস্তাব এনে হিতকারিণী সভাকে শ্রীরামপুর গণগ্রন্থাগার বা জনপাঠাগার বলে চিহ্নিত করেন। এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন গোপীকৃষ্ণ গোস্বামী এবং হেরম্ব গোস্বামী। পরে এই গ্রন্থাগারে অনেক বই দান করেন রাজা কিশোরীলাল এবং তাঁর পুত্র তুলসী চন্দ্র গোস্বামী। বর্ধমানের রাজপরিবার থেকেও অনেক গ্রন্থ দান করা হয়েছিল। ১৯২৪ সালে বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল গ্রন্থাগারটি পরিদর্শন করেন এবং সন্তুষ্ট হয়ে হান্টারের ‘ইম্পেরিয়াল গেজেট’-এর একটি সেট দান করেন।

তবে এরও আগে ১৮০১ সালেই স্থানীয় যুবকরা গঠন করেছিল 'Mutual Improvement Association' - যেখানে তারা তাদের সুচিন্তিত মতামত পেশ করত। তবে এখানে বই সংরক্ষণাবেক্ষণের খুব বেশি ব্যবস্থা ছিল না। এই সমিতির পৃষ্ঠপোষকরা ছিলেন তৎকালীন সমাজের বিখ্যাত মানুষরা, ব্রহ্মমোহন মল্লিক, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ। ১৮৮৫ সালেই এই সমিতি শ্রীরামপুর গণগ্রন্থাগার-এর সাথে যুক্ত হয়। ফলে আকারে-বহরে, বই এবং সদস্য সংখ্যায় এই পাবলিক লাইব্রেরি অনেক বেড়ে যায়, দরকার পরে নতুন এক জায়গার। রাজা কিশোরীলাল সেই উদ্যোগ নিলেও তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র তুলসী চন্দ্র গোস্বামী, যিনি ছিলেন পার্লামেণ্টের সদস্য, সুদক্ষ বক্তা এবং কংগ্রেসের তরুণ তুর্কি, ১৯২৭ সালেই তাঁর পিতার নামে এই পাবলিক লাইব্রেরির জন্য এই বিশাল বাড়িটি তৈরি করে দেন। এই বিশাল বাড়ির একদিকে ছিল পাবলিক লাইব্রেরি এবং আরেকদিকে ছিল স্থানীয় পৌরসভার অফিস। ১৯২৮ সালে শ্রীরামপুর পাবলিক লাইব্রেরি পাকাপাকি ভাবে এই বাড়িটিতেই স্থানান্তরিত হয়। 

এই গ্রন্থাগারটি যথাক্রমে ১৯২৯ ও ১৯৩১ সালে ‘বেঙ্গল লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন’ এবং ‘ইন্ডিয়ান লাইব্রেরি অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্যপদ লাভ করেছিল। ১৯৩৩ সালে এই গ্রন্থাগারেই ‘এশীয় গ্রন্থাগার সম্মেলন’-এর অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কুমার মুনীন্দ্র দেব রায়, নিউটন মোহন দত্ত, হেরম্বনাথ মৈত্র, দীনেশচন্দ্র সেন, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়, খোদা বক্স এবং আরও অনেক বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন বিভিন্ন সময়ে এর নানা অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলেন। 

ঊনবিংশ শতাব্দীতে অবিভক্ত বাংলার সমগোত্রীয় ২২টি গ্রন্থাগারের মধ্যে ‘শ্রীরামপুর পাবলিক লাইব্রেরি’ ছিল অন্যতম বিখ্যাত একটি গ্রন্থাগার। 

এবার আসি শ্রীরামপুর পৌরসভার কথায়। সম্ভবত ড্যানিশদের আমলেই এই পৌরসভা গঠিত হয়েছিল বা শহর-পরিচালনার একটি প্রশাসন ছিল। শ্রীরামপুর পৌরসভার ওয়েবসাইটে পাচ্ছি পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান মিস্টার জ্যাকসনের নাম, সময় লেখা ১৮৪২। মানে তখনো ড্যানিশ অধীনে শ্রীরামপুর। তারপরে ১৮৪৫ সালে শ্রীরামপুর আসে ব্রিটিশ অধীনে - এবং সম্ভবত ১৮৬৫ সাল থেকে শ্রীরামপুর পৌরসভা আনুষ্ঠানিকভাবে তার যাত্রা শুরু করে। তবে তারও আগে প্রশাসনিক কাজের সুবিধার জন্য শ্রীরামপুর বাংলার প্রথম শহর হিসেবে স্বেচ্ছায় Municipal Act of 1850 Sec XX16 ধারাটি গ্রহণ করেছিল। (দ্বিতীয় শহরও এই হুগলি জেলার - উত্তরপাড়া পৌরসভা)। 

পরবর্তী সময়ে যাঁরা শ্রীরামপুরের পৌরপ্রধান ছিলেন - Sir William Hirachel (1876), A. H. Heigard (?), নন্দলাল গোস্বামী (1884-93), ডঃ তৈলক্যনাথ মিত্র (১৮৯৪-৯৬), ডঃ কেদারনাথ চ্যাটার্জি (১৮৯৭-১৯০২), রাজা কিশোরীলাল গোস্বামী (১৯০৩-০৯), বরদা প্রসাদ দে (১৯১০-২৪), ডঃ প্রমথ নাথ মুখোপাধ্যায় (১৯২৫-২৮), রায় বাহাদুর মহেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ি (১৯২৯-৩১), কানাই লাল গোস্বামী (১৯৩২-৫৮)।

সেই সময়ে যাঁরা সহ-পৌরপ্রধান ছিলেন -  T.D. Byeton (1875),  J.A. Green (1876), রায় বাহাদুর কেদারনাথ চ্যাটার্জি (১৮৭৬-৭৭), রায় বাহাদুর মহেন্দ্র চন্দ্র লাহিড়ি (১৮৯৪-৯৯), বরদা প্রসাদ দে (১৯০৩-০৭), ডঃ প্রমথ নাথ মুখোপাধ্যায় (১৯১০-১৩), বসন্ত কুমার ভট্টাচার্য (১৯১৯-২১), শরৎচন্দ্র গোস্বামী (১৯২২-২৬), ললিত মোহন ভট্টাচার্য (১৯২৬-২৮), কৃষ্ণ মোহন ভট্টাচার্য (১৯২৮-৩৪), নগেন্দ্র নাথ রায় (১৯৩৫-৩৮), বিভূতিভূষণ গাঙ্গুলি (১৯৩৯-৪২), জীতেন্দ্র নাথ লাহিড়ি (১৯৪৫-৪৮)। 

[স্বাধীনতা অবধি, তথ্য - শ্রীরামপুর পৌরসভার ওয়েবসাইট - https://seramporemunicipality.com/administration.php]

No comments: