Wednesday, April 09, 2025

শ্রীরামপুরঃ ফেরি ঘাট, রায় ঘাট, নিশান ঘাট, পশু পাখির হাট

শ্রীরামপুরে যে ফেরি ঘাট-টি আছে সেটি গঙ্গা পেরিয়ে বারাকপুরের ধোবিঘাটের সাথে যুক্ত। এই ঘাটটি চাঁদনি ঘাট নামেও পরিচিত হলেও যুগল আঢ্য ফেরিঘাট নামেই বেশি পরিচিত। এছাড়া বল্লভপুরের ঘাট যুক্ত ওপারে রাসমণি ঘাটের সাথে, মাহেশের জগন্নাথ ঘাট যুক্ত ওপারের টিটাগড়ের লক্ষ্মী ঘাটের সাথে। যুগল আঢ্য ঘাট এবং ধোবিঘাটের মধ্যে ফেরি যোগাযোগের ইতিহাস অনেক পুরোনো, প্রায় ৩০০ বছর - প্রথমে নৌকা চলত। পরে আসে ভুটভুটি। এক সময় লঞ্চও চলত। কিন্তু গঙ্গার নাব্যতা কমে যাওয়ায় লঞ্চ বন্ধ হয়ে ভুটভুটি ফিরে আসে। ব্রিটিশ আমলে নাকি বারাকপুরের এই ঘাটে জামা-কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করত ধোপারা। সেই থেকেই এই ঘাটের নাম হয়ে যায় ধোবিঘাট।
শ্রীরামপুর ফেরিঘাট

তবে ধোবিঘাটে সেই অর্থে ঘাট নেই, আছে ফেরির জন্য জেটি। কিন্তু শ্রীরামপুরের ফেরিঘাটের একটা Structure আছে, যা থেকে মনে হয় এখানে আগে স্নানের ঘাট থাকলেও থাকতে পারে। এবং এই ঘাট প্রাঙ্গণে আছে একাধিক ছোট ছোট মন্দির। 

স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী-সহ প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ হাজার মানুষ দুই ঘাট দিয়ে পারাপার করেন, সেই হিসেবে কলকাতার বাইরে এই ফেরি সার্ভিস অন্যতম ব্যস্ত ফেরি সার্ভিস। ২০১৮-১৯ সালে রাজ্য সরকারের ভর্তুকিতে ‘জলধারা’ প্রকল্পে দু’টি ভেসেল কেনা হয় এই ফেরি সার্ভিসের জন্য। সেগুলির দাম ছিল এক-একটি ৩৩ লক্ষ টাকা। ২০২১ সালে রাজ্যের পরিবহণ দফতরের তরফে আরও দু’টি ভেসেল দেওয়া হয় শ্রীরামপুর পুরসভার মাধ্যমে। সেগুলির এক-একটির দাম ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি। ২০১৯ সালের গোড়ার দিকে ধোবিঘাটের নতুন জেটি তৈরির কাজ শুরু হলেও পল্টন জেটি বা গ্যাংওয়ে তৈরি হতে দেরি হয়। ২০২৪ এর পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ পরিবহণ দপ্তর দুই পাড়েই নতুন জেটি তৈরি করে। তাহলেও ধোবিঘাটের স্থায়ী জেটি বিভিন্ন কারণে চালু হয়নি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনে বারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অনুমতি পেতে দেরি এবং রাজ্য পরিবহণ দপ্তরের গড়িমড়িতে ধোবিঘাটের স্থায়ী জেটি এখনো পুরোপুরি চালু নেই। নতুন জেটি চালুর জন্য বারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড মাসে ভাড়া বাবদ পরিবহণ দপ্তরের থেকে তিন লক্ষ টাকা চেয়েছে, এখন এই নিয়ে চলছে দর কষাকষি। তবে জোয়ারের সময় বাঁশের জেটি ছেড়ে নতুন জেটি দিয়েই পাড়াপাড় হয়। আশা করা যায় ডবল ইঞ্জিন সরকার আসায় এই সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে।

ধোবি ঘাটের কাঠের জেটি (২০২১)

ধোবি ঘাটের কাঠের জেটি (২০২৪)

শ্রীরামপুর থেকে দিনের প্রথম লঞ্চটি ছাড়ে ভোর ৫টায়, উল্টোদিকে ধোবিঘাট থেকে প্রথম লঞ্চটি ছাড়ে ভোর ৫ঃ১০-এ। রাতে শেষ লঞ্চ ছাড়ে ধোবিঘাট থেকে রাত ১০ঃ৩০টায় আর শ্রীরামপুর থেকে ছাড়ে রাত ১০ঃ৪৫-এ। 

এর একটু দূরেই, উত্তরদিকে আছে রায় ঘাট, অনেক এটিকে বাবু ঘাটও বলে থাকেন। এর বয়সও ১৫০ বছরের বেশি। ড্যানিশ ও ব্রিটিশ আমলে এই ঘাটটি মূলত ভারতীয় ধনী এবং জমিদার শ্রেণীর পরিবারের মানুষরাই ব্যবহার করতেন - তাই নাম বাবু ঘাট (Baboo Ghat)। এখন নাম রায় ঘাট, সম্ভবত রায় পরিবার থেকে এই ঘাটটি পরবর্তীকালে সংস্কার হয়। পাশেই কিছু মন্দির আছে। এলাকাতে অবাঙ্গালি পরিবারের ভিড় বেশি। আজকের দিনে অবশ্য এই ঘাট সবার জন্যই - বিভিন্ন পুজোর কাজ (যেমন ছট পূজা), পারিবারিক-সামাজিক কাজ এবং পুজোর সময় মূর্তি বিসর্জন এই ঘাটে হয়। বর্তমানে এই ঘাটটির সংস্কার করেছেন Kolkata Metropolitan Water and Sanitation Authority (K.M.W & S.A.)।


এর উত্তরে একটু এগোলেই ডেনমার্ক টার্ভন এবং তার সামনে নিশান ঘাট এবং পাশে মহকুমা শাসকের বাংলো।  

নিশান ঘাট - নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এখানে নিশান উড়ত। আসলে ডেনিশ গর্ভনরের বাড়ি থেকে নর্থ গেট হয়ে একদম সোজাসুজি ছিল গঙ্গার ধারে এই নিশান ঘাট। এবং ডেনিশ আমলে এখানেই নদীপথে পণ্য এসে নামত। এখানে ছিল একটি ফ্ল্যাগস্টাফ, এক সারি কামান (saluting cannons) এবং একটি রক্ষীঘর। বিশেষ দিনে এখান থেকে কামানে তোপ দাগা হত। উল্টোদিকে ব্রিটিশরাও তার অভিবাদনে কামান দাগত। 

A painting by Peter Anker, dated 1790 | Photo Credit: Historical Museum of Oslo
You can see the Denmark Tavern to Right, Roman Catholic Church on Left and in the middle the Nishan Ghat located by the bank of the river Hooghly in Serampore.

From the North Gate of Danish Governor House - you can see straight to the Nishan Ghat

আজকের নিশান ঘাট


নিশান ঘাট থেকে শুরু করে Upper Strand Road (মহাত্মা গান্ধী রোড) কিছুদূর অবধি গঙ্গার ধারে একটি লম্বা পার্ক আছে পঞ্চমুখী হনুমান মন্দির পর্যন্ত।

কোভিড মহামারির পরে শ্রীরামপুরে গঙ্গার ধারে নিশান ঘাটের সামনে মহকুমা শাসকের বাংলো চত্বরে শুরু হয় সাপ্তাহিক 'পশু পাখির হাট'।  


২০২৩ সালের ২২ শে জানুযারী থেকে প্রতি রবিবার এই হাট শুরু হয়েছিল। কলকাতা গ্যালিফ স্ট্রীটের মত-ই সরকারি আইন মেনে বিভিন্ন পশু, পাখি, মাছ এবং গাছ-গাছালি এই হাটে বিক্রি শুরু হয়। তবে ২০২৬-এর জুলাই মাস থেকে এই হাট বন্ধ হয়ে যায়। 

Serampore Ferry Ghat
Barrackpore Dhobi Ghat
Serampore Jugal Adhya Ghat
Serampore Animal Market
Serampore Poshu Pakhir Haat
Serampore Roy Ghat 
Serampore Baboo Ghat
Serampore Nishan Ghat 

তথ্যসূত্রঃ
Serampore Heritage Inventory 29.08.2016 (pdf)
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর।

No comments: