Thursday, February 23, 2023

শ্রীরামপুর ইউনিয়ন ইন্সটিটিউশন

শিক্ষার দিক থেকে শ্রীরামপুর কলকাতার থেকে কিছু কম ছিল না। ১৯০০-এর আগেই  এখানে তিনটি স্কুল স্থাপিত হয় - দে স্ট্রীটে বল্লভপুর হাই স্কুল (১৮৬৭), কৃষ্ণমোহন ভট্টাচার্য স্ট্রীটে শ্রীরামপুর ইউনিয়ন ইন্সটিটিউশন (১৮৮৪) এবং চাতরায় নন্দলাল ইন্সটিটিউশন (১৮৭৩)। 

কলকাতায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৬৪ সালে মেট্রোপলিটন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এই শুনে শ্রীরামপুরের কিছু ভদ্রলোক কলকাতায় গিয়ে বিদ্যাসাগরের সাথে দেখা করে শ্রীরামপুরে এই স্কুলের একটি শাখা খুলতে অনুরোধ করেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় তখন তাঁদেরকেই উৎসাহিত করেন নিজেদেরকেই একটি বিদ্যালয় শুরু করতে। 

Tuesday, February 21, 2023

শ্রীরামপুর কুণ্ডু বাড়ি

কুণ্ডু বাড়ির খোঁজ আমি পাই ইণ্টারনেটে কিছু পোস্ট থেকে। শ্রীরামপুরে যে কয়েকটি বনেদীবাড়িতে দুর্গাপূজা হয় কুণ্ডুবাড়ি তাদের মধ্যে অন্যতম। ১৮৮৫ সাল নাগাদ থাকোগোপাল কুণ্ডু এই দুর্গাপূজার সূচনা করেন। ইনি ছিলেন ঘি আর আখের গুড়ের ব্যবসায়ী - বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে আমদানি করে বেশ পয়সা কামিয়ে ছিলেন। প্রথমে কুণ্ডুবাড়ির দূর্গা দালান বা চণ্ডীমণ্ডপটি ছিল খড় এবং মাটির তৈরি, পরে চুনসুরকি দিয়ে বানানো হয়। পরবর্তীকালে সিমেন্ট দিয়ে কিছু কিছু পুনঃনির্মাণ করা হয়। বর্তমান ঠিকানা ননীলাল ভট্টাচার্য ষ্ট্রীট।  

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যবাহিনী এই বাড়ির দখল নেয় এবং দূর্গাদালানটি ভেঙ্গে ফেলার চেষ্টা করে। সেই মুর্হুতে একটি ভূমিকম্প হয় এবং শেষ অবধি ব্রিটিশ সৈন্যরা দূর্গাদালানটি না ভেঙ্গেই কুণ্ডুবাড়িতে থাকতে থাকে। 

শ্রীরামপুর কলেজ এবং কেরী মিউজিয়াম, পঞ্চানন কর্মকার, চটকল, শ্রীরামপুর জননগর ব্যাপ্টিস্ট চার্চ এবং টেক্সটাইল কলেজ

এরপর চলে আসি শ্রীরামপুর কলেজ এবং কেরি মিউজিয়ামে। 

ভারতে উইলিয়াম কেরি (১৭ আগস্ট ১৭৬১  - ৯ জুন ১৮৩৪) এসেছিলেন মূলত ক্রিশ্চান ধর্ম প্রচার করতে, কিন্তু তাঁর কাজ ধর্ম প্রচারের গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ সংস্কারের পথ দেখিয়েছিল। মার্শম্যান এবং ওয়ার্ডের সহায়তায় কেরি শুধু কলেজই শুরু করেননি, তার সাথে সাথে করেছেন অসংখ্য বইএর অনুবাদ - বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায়। তার প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপা হত সমাচার দর্পণ, দিগদর্শন এবং ফ্রেন্ডস অফ ইন্ডিয়া - এই পত্রিকাগুলোকে আজকের স্টেটসম্যান এর দাদু-ঠাকুরদা বলাই যায়। বাংলায় বাইবেল অনুবাদ ছাড়াও কেরী বহু বই সংস্কৃত ভাষা থেকে অনুবাদ করেন। সত্যি কথা বলতে গেলে বাংলার জন্য কেরী সাহেবের অবিস্মরণীয় কীর্তিকলাপ এই ক্ষুদ্র পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। 

১৭৯২ সালে ইংল্যাণ্ডের ডিডকট শহরে ব্যাপ্টিস্ট মিশনারী সোসাইটি স্থাপিত হয়। এই সোসাইটির উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে খ্রীষ্টধর্ম প্রচার শুরু হয়। মূলত এই উদ্দ্যেশ্যেই ১৭৯৩ সালের ১৩ জুন নরদাম্পটনের উইলিয়াম কেরী তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ফিলিক্স, স্ত্রী ও কন্যাসহ ভারতীয় উপমহাদেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। ১১ নভেম্বর তিনি ও তার সহযাত্রীগণ কলকাতায় পৌঁছান। তার পর থেকে কেরী ভারতীয় ভাষাগুলি শিখতে মগ্ন হয়ে পরেন এবং বাংলায় বাইবেল অনুবাদও করে ফেলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে ব্রিটিশ সরকার খ্রীস্টান ধর্ম প্রচারের কাজে যুক্ত মিশনারীদের কাজে বিরক্ত হন এবং তাদের কাজে বাধা তৈরি করেন। 

শ্রীরামপুর: দে বাড়ী

মাহেশ, বল্লভপুর ঘুরে এবার গন্তব্য শ্রীরামপুরের মূল শহর। 

এবার আমাদের গন্তব্য দে স্ট্রীট। প্রথমেই যাব দে বাড়িতে। ঠাকুরদালান সম্বলিত এই বাড়ি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো আর এখানকার দূর্গাপুজোও খুব বিখ্যাত। হুগলি জেলার বনেদী বাড়ির পুজোর লিস্ট করতে বসলে দে বাড়ির পুজোকে বাদ দেওয়া যাবে না। কাছেই দে ঘাট - দে পরিবার নিজেদের জন্য বানালেও এখন সবার জন্যই খোলা। এই ঘাটে এখন বেশ কিছু ছোট মন্দির দেখতে পাওয়া যায় - করুণাময়ী কালীমাতা, চৌরঙ্গী বাবা এবং দূর্গামাতার মন্দির। 

দে বাড়িকে অনেকেই জমিদারবাড়ি বলে ভুল করে, কিন্তু এঁনারা ছিলেন মূলত কলকাতার বড়বাজারের লবণ ব্যবসায়ী। শ্রীজ্ঞানেন্দ্রনাথ কুমারের 'বংশ-পরিচয়' (২য় খণ্ড) (প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি, ১৯২২) থেকে জানা যায় যে ষোড়শ শতকের শুরুতে কলকাতা-সংলগ্ন দমদমার কাছে গীতী নামক গ্রামে এই বংশের আদি বাসস্থান ছিল, পরে শ্রীরামপুরের কাছে রিষিড়া গ্রামে চলে আসেন। মোটামুটি ১৭০০ এর শুরুতে এই বংশের পূর্ব-পুরুষ রামভদ্র দে ব্যবসা উপলক্ষে শ্রীরামপুরে স্থিতু হন। ১৭৪৮ সালে (বা ১৭৫০ সাল) দে পরিবারের দুর্গাপুজোর শুরু হয় রামভদ্র দে-র হাত ধরে।

Monday, February 20, 2023

শ্রীরামপুর: জলকল, হেনরি মার্টিনের প্যাগোডা এবং অল্ডিন হাউস

শ্রীরামপুর জলকল

মাহেশ, জননগর, বল্লভপুর, আকনা ঘুরে এইবার যাচ্ছি শ্রীরামপুর জলকল-এ। 

কলকাতায় জল সরবরাহ শুরু হয় ১৮৭০ সাল নাগাদ। তার আগে গঙ্গার জল বড় বড় জালায় ভরে রাখা হত। শোনা যায় যে ব্রিটিশরা ১৮৯৪ সাল থেকেই গঙ্গার জল নিয়ে গবেষণা করত। তখন জানা যায় পলতার জল বেশি লবণাক্ত, সেই কারণেই পলতায় পানীয় জল শোধনাগার গড়ে ওঠে। পলতা-বারাকপুরের বিপরীতে রয়েছে শ্রীরামপুর (হুগলী) - সেখানকার জল তুলনায় কম লবনাক্ত। ফলে এখানে জল সরবরাহ কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয় হাওড়া এবং হুগলীতে জল সরবরাহের জন্য। 

১৮৯৬ সালের ১০-ই জানুয়ারি বাংলার ছোট লাট আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি ৮২ বিঘা জমির উপর বার্ন কোম্পানির হাতে তৈরি করা হাওড়া মিউনিসিপ্যালিটির পানীয় জল ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন।  এরমধ্যে জল থিতানোর জন্যে ৪ টি পুকুর এবং পরিশোধনের জন্য ১১ টি ফিল্টার বেড আছে। আজ এরই নাম হাওড়া ওয়াটার্স ওয়ার্ক্স - এখান থেকে দৈনিক ১২৬ লক্ষ গ্যালন জল হাওড়া শহরের পঞ্চানন তলা রোড, সালকিয়া, কৈপুকুর এবং শিবপুর জলাধারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়।

Saturday, February 18, 2023

শ্রীরামপুর: মদনমোহন মন্দির

মদনমোহন মন্দিরটি শ্রীরামপুরের আকনা, চৌধুরী পাড়াতে অবস্থিত। বল্লভপুরের রাধাবল্লভ জীউ মন্দির থেকে হেঁটেই এই মন্দিরটিতে আসা সম্ভব। শ্রীরামপুর স্টেশন থেকে প্রায় ২ কিমি দূরে আকনা চৌধুরীপাড়া। 

মদনমোহন মন্দির (২০২০)

এখন যেখানে ওয়ালশ হাসপাতাল ঠিক সেই জায়গায় দক্ষিণ ভারতীয় রামানুজ সম্প্রদায়ের (অন্য মতে নেপালের ধ্রুবানন্দ ব্রহ্মচারী সম্প্রদায়) কিছু  বৈষ্ণব বাস করতেন। ভজন-নামসংকীর্তন করে তাঁরা দিন কাটাতেন। একটি বৈষ্ণব আখড়া গড়ে ওঠে এখানে। শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায় এই জমিটি এই বৈষ্ণবদের দান করেন। তাঁরা সেই আখড়ায় মদনমোহনের একটি বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁরা কোন কারণে এই আখড়া ছেড়ে চলে যান, বিগ্রহটি এখানেই থেকে যায়। আখড়া-ভবনটি আস্তে আস্তে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং জঙ্গলে ঢাকা পড়ে যায়। 

শ্রীরামপুর: বল্লভপুরের রাধাবল্লভ জীউ মন্দির

এবার আসুন বল্লভপুর। এখানে দেখে নিন ২৫০ বছরের বেশি পুরোনো রাধাবল্লভ মন্দির, সংলগ্ন রাসমঞ্চ, রাধা বল্লভ ঘাট। পাশেই আছে গঙ্গার ধারে নবনির্মিত শশ্মানকালীর মন্দির এবং উগ্রতারা তীর্থ। এর ঠিক উলটো পাড়ে বারাকপুর ও টিটাগড়ের মাঝে অন্নপূর্ণা মন্দির এবং রাসমণি ঘাট।  

রাধাবল্লভ জীউ মন্দির

এই রাধাবল্লভের মন্দির থেকেই এই এলাকার নাম হয় বল্লভপুর। 

এই মন্দিরের ইতিহাস সম্পর্কে দুটি মত আছে। একমত বলে যে এই মন্দিরের বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেন রুদ্ররাম। রুদ্ররাম ছিলেন শাক্ত এবং তাঁর মামা ছিলেন শ্রীরামপুরের চাতরা নিবাসী বৈষ্ণবচূড়ামণী, শ্রীচৈতন্য পরিকর, পণ্ডিত কাশীশ্বর।

কাশীশ্বর পণ্ডিত ছিলেন অত্যন্ত গোঁড়া বৈষ্ণব। তিনি প্রতিদিন নিজের হাতে তাঁদের কুলদেবতা শ্রীকৃষ্ণের পূজা করতেন। তিনি কোন অ-বৈষ্ণবকে এই বিগ্রহ  ছুঁতে দিতেন না। একদিন কোন কারণে তাঁর বাড়িতে ফিরতে দেরি দেখে তাঁর ভাগনে রুদ্ররাম শ্রীকৃষ্ণের পূজা সম্পন্ন করেন। বাড়ি ফিরে এসে কাশীশ্বর এই দেখে খুবই রাগ করেন এবং রুদ্ররামকে গালিগালাজ করেন। মনের দুঃখে রুদ্ররাম বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসে আকনায় (এখন বল্লভপুর) গঙ্গার ধারে এক জায়গায় আশ্রয় নেন এবং শ্রীকৃষ্ণের প্রার্থনায় মগ্ন হন।