উনিশ শতকে ষাটের দশকে নাট্যকার ও কবি দীনবন্ধু মিত্র কিছুদিন শ্রীরামপুরে পােষ্টমাস্টার হয়ে ছিলেন। তাঁর 'সুরধুনী' কাব্যে তিনি এই শহর সম্পর্কে যা বর্ণনা দিয়েছেন-
সুধাম শ্রীরামপুর শােভা অভিরাম
হাতে ঝুলী, নামাবলী, মুখে হরিনাম।
এই স্থানে আদি মিশনারী - নিকেতন,
দিনামর-নরপতি-সদনে স্থাপন।
কিবা কলেজের বাড়ি দেখিতে সুন্দর,
অগণন বাতায়ন, দীর্ঘ কলেবর।
পিতলের রেলসহ ললিত সােপান,
অপূর্ব প্রান্তর পথ, সুরম্য উদ্যান।
সর্ব অগ্রে ছাপাখানা এই স্থলে হয়।
মুদ্রিত হইল যাহে বঙ্গ-গ্রন্থচয়।
কাগজের কল হেথা অতি চমৎকার,
জন্মিছে কাগজ তায় বিবিধ-প্রকার।
ডেনমার্ক ন্যাশনাল মিউজিয়াম, কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়্যালড্যানিয়া এবং রাজ্য হেরিটেজ কমিশন, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর এবং পর্যটন দফতরের প্রয়াসে শ্রীরামপুরের প্রাচীন স্থাপত্যগুলো ফিরে পাচ্ছে তাদের পুরোনো রূপ।
১৭৫৫ সালে বাংলায় তৎকালীন মুঘল সুবেদার নবাব আলিবর্দি খান ডেনিস এশিয়াটিক কোম্পানিকে শ্রীরামপুরে একখণ্ড জমির ওপর থাকবার অনুমতি দেয়। নির্দিষ্ট শুল্ক'র বিনিময়ে নবাব তাদের বাংলা, বিহার ও ওড়িশাতে বাণিজ্যের অধিকার দেন। দিনেমাররা তাদের রাজা পঞ্চম ফ্রেডরিকের সম্মানে জায়গাটার নাম রাখে ফ্রেডরিকসনগর। ১৭৫৯ সালে শেওড়াফুলির জমিদারের সঙ্গে একটি স্থায়ী লিজচুক্তির মধ্য দিয়ে দিনেমার এলাকাটি বিস্তৃত হয়। এই সূত্রে দিনেমার অধিকৃত অঞ্চলের মধ্যে পড়ে শ্রীরামপুর ও আকনা গ্রাম, এবং পিয়ারাপুরের কৃষিজমি। দিনেমাররা এই এলাকায় কর আদায় ও আইন বলবৎ করার অধিকার পায়।
প্রথমে দিনেমার বাণিজ্যকেন্দ্রটিতে একটি গুদাম ও কতকগুলো মাটির দেওয়াল দিয়ে তৈরি সাধারণ বাড়ি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। গভর্নমেন্ট হাউসটিও ছিল মাটির। এক রবিবারের মধ্যাহ্নভোজনের সময় সেটা ভেঙে পড়ে, অতিথিরা জানলা গলে প্রাণরক্ষা করেন। আজকে আমরা যে বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা তৈরি হয় ১৭৭১ সালে, ইটের তৈরি এই রাজকীয় বাড়িটি দিনেমার প্রশাসনের কেন্দ্র ও শ্রীরামপুরের প্রধানের নিবাস হিসেবে ব্যবহৃত হত। এই Danish Government House-এর চারদিকে ছিল Danish Administrative Complex।
ড্যানিশ/দিনেমার ব্যবসায়ীরা গোড়ার দিকে এই দেওয়াল ঘেরা প্রশাসনিক কেন্দ্রের মধ্যেই থাকত, কিন্তু শ্রীরামপুর বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকে দেশ থেকে নিজেদের পরিবারকে নিয়ে পরের বাসাবাড়িতে থাকতে শুরু করল, কেউ বা নিজের মত বাড়ি বানিয়ে নিল।
এর পাশে ড্যানিশরা একটি বাজার গড়ে তোলে - যার নাম ছিল টিনবাজার। সেই বাজার আজ আর না থাকলেও ড্যানিশ সরকারি কমপ্লেক্সের দক্ষিণাংশ এখনও টিনবাজার। এই বাজারে ড্যানিশদের মালগুদাম তো ছিলই, কিছু ব্যক্তিগত গুদামঘরও ছিল। ফলে স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের ভিড় এখানে লেগেই থাকত।
কর্নেল ওলে বি'র সুশাসনে আস্তে আস্তে শ্রীরামপুরের বিকাশ শুরু হয়। প্রথমে ড্যানিশরা কুঠিয়াল থেকেই সিল্কের জিনিসপত্র কিনত, পরে সরাসরি উৎপাদক শিল্পীদের থেকেই মাল কেনা শুরু করে। ভাল সিল্কের জিনিসের জন্য কখনো কখনো ড্যানিশরা বেশি দামও দিত ফলে স্থানীয় কারিগররাও ড্যানিশদের সাথে ব্যবসা করতে উৎসাহিত হত।
শোভারাম বসাক এবং অনন্তরাম ধোবা ছিলেন ড্যানিশদের একদম শুরুর দিকের দুই কুঠিয়াল (factors)। এরপরে বিভিন্ন ব্যবসায়ী মধ্যগ বা ফড়িয়া শ্রেণীর উৎপত্তি হয়, যেমন বেনিয়া, মুৎসুদ্দি, এজেন্ট, জাহাজ বোঝাই করার খালাসী/কুলি। ডেনদের প্রথম এজেণ্ট ছিলেন নন্দলাল চক্রবর্তী, পরে তিনি দিওয়ান হন। ডেনদের যবক্ষার/সল্টপিটার সরবরাহ করতেন মূলত সাফলি রাম দে (দে বাড়ি) এবং বাঁকুড়ার কোতুলপুর থেকে আগত পতিত পাবণ রায়।
আজকের শ্রীরামপুরের রাজবাড়ি বা গোস্বামী বাড়ির ইতিহাসও দাঁড়িয়ে আছে ডেনদের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্যের সাথে। হরিনারায়ণ গোস্বামী ছিলেন Dane-দের শুল্ক বিভাগের দেওয়ান, তাঁর আমলেই এই পরিবারের অর্থনৈতিক সম্বৃদ্ধি শুরু হয়।
১৮৪৫ সাল পর্যন্ত দিনেমার শাসনকালে বেশ কয়েকবার ভবনটি পুনর্নির্মিত হয়। আকারেও বাড়ে। দোতলায় ঘর তৈরি হয় ১৮৪২ সালে। ব্রিটিশ শাসনের সময় মহকুমা শাসকের দফতর ও আদালত ভবন হিসাবে ব্যবহারের জন্য আরও প্রসারিত হয়। স্বাধীনতার পরেও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সরকারি দফতর ছিল এখানে। কিন্তু ১৯৯০-এর পর এই বাড়িটি ভগ্নপ্রায় হয়ে পড়লে সরকারি অফিস অন্যত্র সরে যায়। ১৯৯৫-এর আশে পাশে এই বাড়িটি এবং কমপ্লেক্সের দেওয়ালের গায়ে চিত্রিত করা হয়েছিল শহরের ইতিহাস। শহরের ইতিহাস সংরক্ষণ এবং তা সাধারণ মানুষকে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তখনকার মহকুমাশাসক শমিষ্ঠা ঘোষ। তিনি অন্যত্র বদলি হতে সেই ধারাবাহিকতা আর রাখা হয়নি।
২০০৮ সালে ওয়েস্ট বেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন ও শ্রীরামপুর পুরসভা সংস্কারের কাজ শুরু করে, কাজ শেষ হল ২০২২ সালে। মহকুমা তথ্য এবং সংস্কৃতি দপ্তরের একটি অফিস আছে এখানে। ২০২৪ সালে এই বাড়িতে খুলে দেওয়া হয়েছে একটি প্রদর্শনী কক্ষ - যেখানে ছবিতে ও লেখায় শ্রীরামপুরের ইতিহাস বলা আছে।
Back of Danish Government House, Serampore |
![]() |
Danish Government House, Serampore |
![]() |
You can see the Olav's Church from the campus of Danish Government House |
এই জায়গাটির উত্তরে এবং দক্ষিণে দুটি গেট আছে - উত্তরের গেট-টি দিনেমারদের আমলে তৈরি, তবে দক্ষিণের গেটটি ব্রিটিশ আমলে নির্মিত।
নর্থ গেট - এটি ছিল এই Administrative compound এ ঢোকার এবং বেরোনোর মূল দরজা। আনুমানিক ১৭৭২ সালে এটি তৈরি করা হয়েছিল। Denmark Tavern এর পাশে যে চাঁদনি ঘাট আছে, সেখান থেকে সোজা হাঁটলে এই নর্থ গেট। ১৮১৫ সালে এই দরজায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসে - দুদিকে জোড়া আয়তাকার থাম (Pilaster) এর সাথে উপরে যুক্ত বিম এবং তার উপরে ত্রিভুজাকৃতি পেডিমেন্ট স্থাপিত হয়।
![]() |
Old Photos of North Gate, Serampore Danish Government Complex |
![]() |
Renovated and again decaying - North Gate, Serampore (2024) |
সাউথ গেটটি ড্যানিশ সরকারি অফিসের ঠিক পিছনেই আছে। ১৮১৫ নাগাদ, ব্রিটিশ আমলে এটি তৈরি হয়। শ্রীরামপুরে রেল স্টেশন চালু হলে এই সাউথ গেটটিই বেশি ব্যবহার হতে থাকে। মূলত পুলিশের আটক করা মালপত্র এখানে রাখা হত। এক সময়ে এটিও প্রায় ভেঙ্গে গেছিল। অফিসটি সংস্কারের সময় এই গেটটিকেও নতুন করে গড়ে তোলা হয়।
![]() |
Blue Plaques of The Main Gate, Danish Government House and The South Gate, as honored by West Bengal Heritage Commission (Serampore) |
এছাড়াও এই চত্বরে একাধিক ড্যানিশ/ইংরেজ আমলে তৈরি বাড়ি আছে। যেমন, Bar Association, Judicial Magistrate Court, Office of Addl. SDPT of Police, Old BL & LRO (block land and land records office) and SDL&LRO Office। পুরনো ল্যাণ্ড রেকর্ডের অফিসটি এখন হেরিটেজ ক্যান্টিন - নাম তার 'ভেতো'।
বার অ্যাসোসিয়েশনের বাড়িঃ প্রায় দেড়শো বছরের পুরনো এই বাড়িটি নর্থ গেট দিয়ে ঢুকেই ডানদিকে দেখতে পাওয়া যায়। গেটের কাছে ইউরোপীয়ন বাংলো স্টাইলের এই বাড়িটি সম্ভবত স্টাফ কোয়ার্টার বা দারোয়ানদের থাকার জায়গা ছিল।
Bar Association, Serampore |
Judicial Magistrate Court: যদিও এই বাড়িটি ইতিহাস ঠিক জানা যায় না, তবে এই বাড়িটি ড্যানিশদের সময়ের পরে, ব্রিটিশ আমলে বানানো - আনুমানিক বয়স ৯০ বছর।
![]() |
Sideview of Office of Additional Superintendent of Police, Serampore in Danish Administration Complex |
পরবর্তীকালে আরো কিছু সরকারি অফিস-বাড়িও এই জমিতে তৈরি হয়।
South Gate দিয়ে বাইরে এসে সোজা তাকালে ডানদিকে দেখতে পাবেন - Old Police Residence।
আরো কিছু হেরিটেজ স্পট - ড্যানিশ সরকারি ভবনের কাছাকাছিঃ
পাল বাড়ি
নর্থ গেট/মেন গেটের ঠিক উল্টোদিকে এই বাড়িটি অবস্থিত। ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিশেষ জানা যায় না। ২০১৬ সালের শ্রীরামপুর নিয়ে করা ড্যানিশ মিউজিয়মের সমীক্ষা থেকে জানা যায় যে 50 N. N. Roy Road-এ অবস্থিত ইউরোপীয় ভিলার অনুকরণে, ড্যানিশ আমলে তৈরি এই বাড়িটি প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো।
সাউথ গেট থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরলে দেখতে পাবেন - ১, গোপীনাথ সাহা স্ট্রীটে দে' পরিবারের বাড়ি এবং ৫ নং ডা. বি এন জট সরণীতে দাস পরিবারের বাড়ি। এই দুটি বাড়িই ড্যানিশ আমলের অর্থাৎ প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। ঝুলবারান্দা (cantilever verandah) এই দুটি বাড়িরই বাহ্যিক শোভা বহুলাংশে বাড়িয়েছে।
![]() |
দে বাড়ি, ১ গোপীনাথ সাহা স্ট্রীট, শ্রীরামপুর // Family House of Dey Family, 1 Gopinath Saha Street, Serampore |
![]() |
দাসবাড়ি, বিএন জট সরণী, শ্রীরামপুর/House of Das family at 5 Dr. BN Jot Road, Serampore |
বুড়ো বিবি লেনের বুড়ো বিবির মাজার
মহরমের মিছিল এখান থেকেই বের হয়।
3/A বুড়ো বিবি লেনে অবস্থিত এই মন্দিরটি একটি শান্ত আধ্যাত্মিক আশ্রম। প্রিয়নাথ কারার ১৮৫৫ সালে শ্রীরামপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী জীবনে তিনি লাহিড়ী মহাশয়ের সাথে দেখা হয় এবং লাহিড়ী মহাশয় তাঁকে ক্রিয়া যোগের পথে দীক্ষা দেন এবং শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি হিসাবে সন্ন্যাসী ধর্ম গ্রহণ করেন। শ্রীযুক্তেশ্বর গিরি ছিলেন যোগানন্দের গুরু।
পরমহংস যোগানন্দ (জন্ম মুকুন্দ লাল ঘোষ; ৫ জানুয়ারী, ১৮৯৩ - ৭ মার্চ, ১৯৫২) ছিলেন একজন ভারতীয় সন্ন্যাসী, যোগী এবং গুরু যিনি তার প্রতিষ্ঠানের Self-Realization Fellowship (SRF)/যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষকে ধ্যান এবং ক্রিয়া যোগের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে শ্রীরামপুর পৌরসভা এবং রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই ড্যানিশ স্থাপত্যগুলি ঘিরে শুরু হয় হেরিটেজ উৎসব। পৌরসভার উদ্যোগে হুগলী নদীবক্ষে একটি রিভার ক্রুজ-এরও আয়োজন করা হয়েছিল। ক্রিসমাসের সন্ধ্যায় শ্রীরামপুরের রাস্তায় রাস্তায় আলোকসজ্জা এবং মানুষের ভিড় কলকাতার পার্ক স্ট্রীটকে মনে করাবেই। তবে এত যে মানুষ এলেন গেলেন, তাদের ক'জনই বা শ্রীরামপুরের ইতিহাস বা ড্যানিশ ঔপনিবেশিক ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে।
This post includes North Gate, South Gate, Danish Government House, Bar Association, Judicial Magistrate Court, Office of Additional Superintendent of Police, Heritage Canteen Vheto, Old Police Residence, House of Pal Family, House of Das Family, House of Dey Family, Buro Bibir Majar, Yukteswar Giri Smriti Temple.
No comments:
Post a Comment