Thursday, August 27, 2026

চন্দননগরঃ হরিহর শেঠ

দেশশ্রী হরিহর শেঠ

হুগলী নদীর ধারে একসময় ছিল লিটল ইউরোপ আর সেই ইউরোপের ফ্রান্স ছিল চন্দননগর। মানে বুঝতেই পারছেন যে চন্দননগরে ফরাসীদের উপনিবেশ ছিল। আর কাছাকাছি শ্রীরামপুরে ড্যানিশরা, চুঁচুড়াতে ডাচেরা, ব্যাণ্ডেলে পর্তুগীজরা এবং হুগলীর উল্টো পাড়ে বারাকপুরে ইংরেজরা ঘাঁটি গেড়েছিল। আজ চন্দননগর বললেই সবার মাথায় ঘোরে জগদ্ধাত্রী পুজো আর তার আলোকসজ্জা (যাকে চলতি কথায় বলে লাইটিং), সূর্যকুমার মোদকের জলভরা আর নদীর ধারে স্ট্রাণ্ড। আজকের গল্প সেই চন্দননগর নিয়ে যখন এখানে ফরাসীদের উপনিবেশ এবং ১৯০০-শতকে এই শহরের উন্নতির পিছনে থাকা একজন মানুষকে নিয়ে। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ক'জন-ই বা মনে রেখেছেন হরিহর শেঠকে? সত্যি কথা বলতে চন্দননগর নিয়ে পড়াশুনা না করলে এঁনাকে আমি চিনতাম না।  

শ্রীরামপুর থেকে ডেন বা ড্যানিশরা চলে যায় ১৮৪৫-এ, তখন কলকাতার খ্যাতি গগনচুম্বী। ব্রিটিশরা সেভাবে আর এই পুরনো শহরের দিকে নজর দেয়নি। কিন্তু শ্রীরামপুরের বিখ্যাত গোস্বামী পরিবারের পরের পর প্রজন্মের এক-একটি মানুষ শহরের উন্নতিকল্পে দান করে গেছেন অকাতরে। গোস্বামীদের নাম সেই অর্থে আজকের প্রজন্ম মনে না রাখলেও শ্রীরামপুরের তথাকথিত রাজবাড়ি তো আসলে গোস্বামীদের-ই বাড়ি। সেই দিক থেকে দেখলে চন্দননগরের নব-রূপকার বা প্রাণপুরুষ হরিহর শেঠ (জন্ম: ১৪ ডিসেম্বর, ১৮৭৮ — মৃত্যু: ১০ মার্চ, ১৯৭২)-কে কিন্তু অনেকেই চেনেন না। 

আরো একটা ঘটনা না বললেই নয়। ১৯৮৭ সালে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান - ‘লেজিয়ঁ দনার’ পেয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু তাঁর আগে চন্দননগরের তিন বাঙালি পেয়েছেন এই সম্মান। ১৮৯৬ সালে প্রথম ভারতীয় হিসেবে এই সম্মান পান দুর্গাচরণ রক্ষিত। তারপর এই সম্মান পেয়েছিলেন আধুনিক চন্দননগরের প্রাণপুরুষ হরিহর শেঠ ১৯৩৪ সালে। আর তৃতীয় বাঙালিটি হলেন হুগলি কোর্টের অ্যাডভোকেট সত্যেন্দ্রনাথ ঘোষ। তিনি ছিলেন চন্দননগরের অন্যতম রাজনৈতিক দল প্রজাসমিতির সভাপতি এবং পরে চন্দননগরের মেয়রও হন। পণ্ডিচেরির গভর্নর ২৪ মার্চ, ১৯৩৬-এ পত্রযোগে সত্যেন্দ্রনাথ ঘোষের ‘লেজিয়ঁ দনার’ প্রাপ্তির কথা জানিয়েছিলেন। 

হরিহর শেঠের পরিবার আদতে ছিল হুগলি জেলার মহানদের বাসিন্দা এবং পরবর্তীকালে ব্যবসার জন্য হারিট এবং তারপরে চন্দননগরে চলে আসেন। এঁরা ছিলেন গোত্রে সোমঋষি এবং জাতে তিলি ক্ষত্রিয়-ব্যবসায়ী। এই পরিবারের আদি উপাধি ছিল নন্দী হলেও ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি তাদের 'শেঠ' বা 'শ্রেষ্ঠী'দের সমকক্ষ করে তোলে এবং ফলস্বরূপ তাঁরা 'শেঠ' উপাধি লাভ করেন।

সম্ভবত কালীচরণ শেঠের সময়ে এই পরিবার চন্দননগরে এসে পৌঁছায় এবং চন্দননগরের বোড় কৃষ্ণপুরে প্রায় সাড়ে ষোলো কাঠা জমির উপর একটি বসতবাড়ি তৈরি করে। কালীচরণের কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন প্রাণকৃষ্ণ শেঠ, প্রাণকৃষ্ণের দ্বিতীয় পুত্র হলেন রাধামোহন শেঠ। রাধামোহন এবং রাধারাণীর পুত্র ছিলেন শম্ভুনাথ শেঠ। মূলত শম্ভুনাথের সময় থেকেই শেঠ পরিবার চন্দননগরের এক বিশিষ্ট পরিবার হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। তবে এই উত্তরণ সহজ ছিল না। 

রাধামোহন শেঠ ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং দানবীর ব্যক্তি। পণ্ডিত শ্রী শিবেন্দ্রনারায়ণ শাস্ত্রী মহাশয়ের লেখা “বাংলার পারিবারিক ইতিহাস, প্রথম খণ্ড” থেকে জানা যায় যে, জীবনের শেষলগ্নে এক ব্রাহ্মণের কাতর অনুরোধে তাঁর নেওয়া ঋণের মৌখিক জামিনদার হন রাধামোহন শেঠ মহাশয়। শেষমেষ সেই ব্রাহ্মণ সেই ঋণশোধ করতে না পারলে চন্দননগরের বোড় কৃষ্ণপুর নামক জায়গার পদ্মপুকুর পল্লীর পৈত্রিক বাসভবনটি বিক্রি করে (১৮১৬ সালে) সেই ঋণ পরিশোধ করেন তিনি। ফলস্বরূপ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে রাধামোহন বাবু চরম অর্থকষ্টের মধ্যে পড়েন। 

এই দারিদ্রের মধ্যেই বড় হয়েছিল রাধামোহনের ছেলে-মেয়েরা। রাধামোহনের পুত্র-কন্যারা হলেন - রামনারায়ণ শেঠ (মধ্যম পুত্র), শম্ভুচন্দ্র (কনিষ্ঠ পুত্র) এবং পদ্মমণি দেবী (জ্যেষ্ঠ কন্যা)। সংসারে জোয়াল কাঁধে এসে পরলে শম্ভুচন্দ্র কলকাতার এক সাধারণ তুলার দোকানে ৬৭ টাকা বেতনে কাজ শুরু করেন। সেই অর্থে প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না। তবে সময় পাল্টালো যখন চন্দননগরের বারাসত নিবাসী অত্যন্ত বিত্তশালী ব্যবসায়ী কার্তিক প্রসাদ শ্রীমানীর কন্যা অন্নপূর্ণা দাসীর সাথে শম্ভুনাথের বিয়ে হল। বিয়ের পর শ্বশুরমশাই নতুন ব্যবসার সূচনা ও উন্নতির জন্য ১০০০ টাকা মূলধন দিয়ে শম্ভুচন্দ্র শেঠ মহাশয়কে সাহায্য করেন । সেই অর্থ দিয়েই তৎকালীন কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলে ছোট করে লোহার ব্যবসা আরম্ভ করেন তিনি - স্থাপন করেন 'শম্ভুচন্দ্র শেঠ এণ্ড সন্স' (Sumbhoo Sett & Sons, Address: 18 Durmahatta St.)। ক্রমে ক্রমে সেই ব্যবসা মহীরুহে পরিণত হয় এবং তিনি হয়ে ওঠেন ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের সাথে লৌহ আমদানি-রপ্তানিকারী প্রথম বাঙালি। ফলত তৎকালীন যুগে লোহা, স্টিল ও হার্ডওয়ার সম্পর্কিত ব্যবসার পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠেন তিনি। বাবার মত তিনিও ছিলেন ধর্মীয় এবং দানবীর এক চরিত্র। 

বিয়ের ঠিক পরপরই শম্ভুচন্দ্র শেঠের শ্বশুরমশাই কার্তিক প্রসাদ শ্রীমানী তৎকালীন পালপাড়া অঞ্চলে একটি ভবন প্রদান করেন - কারণ তত দিনে বিক্রি হয়ে গেছে শেঠ-দের বসত বাড়ি। পালপাড়ার এই বাড়িটিতেই এখন শেঠ বংশের বর্তমান প্রজন্মের মানুষেরা বসবাস করেন। তবে অনেকের মতে শম্ভুচন্দ্র-ই এই বাড়িটি তৈরি করিয়েছিলেন। এই বাড়িতেই তিনি শুরু করেন দুর্গা, কালী, সরস্বতী পূজা, দোল পূর্ণিমার দিন রাধা-কৃষ্ণের পূজা। তবে এঁদের কুলদেবতা ছিলেন রুপোর তৈরি একটি ময়ূর। একসময়ে এই বাড়িতে ছিল ৮০টি তোতাপাখি ও ৪০টি ময়ূরের একটি চিড়িয়াখানা। এবং সেই সাথে বেশ কিছু দুর্লভ উদ্ভিদের একটি নার্সারিও ছিল। বাবার মতোই তিনিও দানধ্যান করতেন। 

ব্যবসায়িক উন্নতির চরম শিখরে উঠলেও শম্ভুচন্দ্রের সাংসারিক জীবন কিন্তু খুব সুখের ছিল না - প্রথম স্ত্রী অন্নপূর্ণার গর্ভেই একটি পুত্রসন্তান মারা যায়, তিনিও অকালে মারা যান। এরপর শম্ভুচন্দ্র দ্বিতীয় বিয়ে করেন তারাসুন্দরী দাসীকে। কিন্তু সেই সুখও বেশিদিন পাননি তিনি। তারাসুন্দরীর পুত্র শ্যামলাল মারা যায় মাত্র ৭ বছর বয়সে, পুত্রশোকে তারাসুন্দরীও তার পরপর মারা যান। এরপর তৃতীয়বারের জন্য শম্ভুচন্দ্র চন্দননগরের বোড়ের বাসিন্দা জীবনচন্দ্র কুন্ডু মহাশয়ের কন্যা সূর্য্মণি ওরফে বিন্দুবাসিনী দাসীকে বিবাহ করেন। বার বার তিনবারের বার তাঁর সাংসারিক জীবন সার্থক হয়, সুখ-শান্তিতে ভরে ওঠে তাঁর সংসার। বিন্দুবাসিনী দাসীর গর্ভে একে একে জন্মগ্রহণ করেন (জ্যেষ্ঠ থেকে কনিষ্ঠ) – রমণীবালা, সৌরভ দাসী, গিরীন্দ্রনাথ, ফুলকুমারী, অক্ষয়কুমার, নৃত্যগোপাল, অঘোরচন্দ্র, রাজেন্দ্রনাথ ও অবিনাশচন্দ্র নামক ছয় পুত্র ও তিন কন্যা। 

চলে আসি শম্ভুচন্দ্র-এর তৃতীয় পুত্র নৃত্যগোপালের কথায় আসি। এক্ষেত্রে বলা ভাল যে অনেকে নিত্যগোপাল বলে থাকলেও পণ্ডিত শিবেন্দ্রনারায়ণ শাস্ত্রীর 'বাঙ্গালার পারিবারিক ইতিহাস'-এ নৃত্যগোপাল-ই লেখা আছে। শম্ভুচন্দ্রের জ্যেষ্ঠপুত্র গিরীন্দ্রনাথ মাত্র চার বছর বয়সে এবং মধ্যমপুত্র অক্ষয়কুমার মাত্র ১৮ বছর বয়সে মারা যান, ফলে অনেকেই নৃত্যগোপালকে শম্ভুচন্দ্রের বড়ছেলে বলে জানেন। নৃত্যগোপালের জন্ম নিয়ে একটু মতবিরোধ আছে। 'বাঙ্গালার পারিবারিক ইতিহাস'-এ লেখা যে, তাঁর জন্ম বঙ্গাব্দ ১২৬৩ সালের ১২ পৌষ বা ২৬ পৌষ এবং সেই বছরে সিপাহী বিদ্রোহ হয়েছিল। এখন ১২ পৌষ হল ১৮৫৬ সালের ২৬শে ডিসেম্বর। সেই দিক থেকে দেখলে ২৬-শে পৌষ, ১২৬৩-কেই সঠিক বলে মনে হয়, কারণ সেই দিনটি হচ্ছে ইংরিজির ৯ই জানুয়ারি, ১৮৫৭। 

নৃত্যগোপালের নয় বছর বয়স যখন তাঁর মা বিন্দুবাসিনী মারা যান, ফলে তিনি বড় হন পদ্মমণি পিসির কাছেই। প্রাথমিক শিক্ষা বাংলা স্কুলে হলেও পরে স্থানীয় গড়বাটির এক ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে ভর্তি হন। এদিকে তাঁর দাদা অক্ষয়কুমার উচ্চশিক্ষা লাভ করেও অকালে মারা যান। ফলে বয়স্ক বাবা শম্ভুচন্দ্র নৃত্যগোপালকে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণীর পরেই স্কুল ছাড়িয়ে দেন এবং পারিবারিক ব্যবসাতে যুক্ত করেন। তবে পড়াশুনা বেশি দূর না হলেও নৃত্যগোপাল ছিলেন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তাঁর বিবাহ হয় বাঁশবেড়িয়ার খামারপাড়া গ্রামের ভুবনচাঁদ কুণ্ডুর মেয়ে সুশীলাবালার সাথে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে সুশীলাবালা এক বছরের মধ্যেই মারা যান, তখন কলকাতা চাঁপাতলার ব্রজকুমার নন্দীর তৃতীয়া কন্যা কৃষ্ণভাবিনী দাসীর সাথে তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ হয়। এর পর-পরই সংসারে ভার সহ কলকাতার ব্যবসা এবং হাটখোলার অন্যান্য মোকামের ভার তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। খুব তাড়াতাড়ি নৃত্যগোপাল ন্যায়নিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। দীনবন্ধু এবং অজাতশত্রু বলে তিনি পরিচিত ছিলেন। শম্ভুচন্দ্র যখন মারা যান তখন নৃত্যগোপালের বয়স মাত্র সাতাশ (১৮৮৪)। 

কৃষ্ণভাবিনী এবং নৃত্যগোপালের ৫ সন্তান, তিন ছেলে - হরিহর, শিবরাম এবং দুর্গাদাস এবং দুই কন্যা - যোগমায়া ও আগমনী। ১৯১৪ সালের ২৪ মার্চ (বাংলার ১০ চৈত্র, ১৩২০) মাত্র ৫৭ বছর বয়সে রোগজনিত কারণে নৃত্যগোপালের মৃত্যু হয়। বিধবা হওয়ার পর কৃষ্ণভাবিনী দেবী ঘুরে বেড়াতেন তীর্থে তীর্থে, বেঁচে ছিলেন আরও ১৫ বছর (মৃত্যুঃ ১৩৩৫ সালের ৬ ফাল্গুন/ ১৯২৯ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, কাশীধামে)।

নৃত্যগোপাল এবং কৃষ্ণভাবিনী দেবী নিজেরাও যেমন খুবই অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন, ছেলেমেয়েদেরও সেই জীবন দর্শনে অভ্যস্ত হতে শিখিয়েছিলেন। 

দানবীর, বিদ্যাবিনোদ, দেশশ্রী হরিহর শেঠের জন্ম ১৪ ডিসেম্বর, ১৮৭৮ সালে (বাংলার ১২৮৫ সাল, ২৮শে অগ্রহায়ণ, শুক্রবার, রাত ২ টোর সময়) শেঠেদের পালপাড়ার বাড়িতেই। তাঁর পড়াশুনা শুরু হয় চন্দননগরের সেন্ট মেরিস ইনষ্টিটিউটে, পরে হুগলী কলেজিয়েটে পড়াশুনা করেন। কলেজজীবন হুগলী কলেজে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত রিপন কলেজে (আজকের সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) শিক্ষালাভ শেষ করেন। পড়াশুনা শেষে বাড়ির বড়ছেলে হিসেবে পারিবারিক লোহার ব্যবসায় ঢুকে পড়েন। বাবা এবং ঠাকুরদার মতোই হরিহরের ব্যবসাজ্ঞান ছিল তুখোর, কয়েকদিনের মধ্যেই কলকাতার লোহা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হন। যতদিন তিনি এই ব্যবসায় ছিলেন ততদিন অবধিই তিনি এই সমিতির সভাপতি পদে স্থিতু ছিলেন। পরে হরিহর সোনা-রুপোর ব্যবসা এবং কলকাতার জমি কেনা-বিক্রি ব্যবসাও শুরু করেন। তবে সোনা-রুপোর ব্যবসায় সফল হলেও জমিজমার ব্যবসায় বেশ আর্থিক ক্ষতিগ্রস্থ হন। পৌঢ় বয়সে তিনি ব্যবসার কাজ থেকে অব্যহতি নেন এবং সামাজিক কাজকর্মেই বেশি মনোযোগ দেন। 

তৎকালীন শিক্ষিত বঙ্গসমাজে হরিহর শেঠের বিশেষ পরিচয় ছিল। 'প্রবাসী', 'ভারতবর্ষ', 'মাসিক বসুমতী' 'বঙ্গবাণী', 'ভারতী', 'বিচিত্রা', 'প্রদীপ' প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের আজীবন সদস্য এবং চন্দননগরের জাহ্নবী আবাসে (বর্তমানে রবীন্দ্র ভবন) ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত বিংশতি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের প্রধান সংগঠক ছিলেন। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং অনুষ্ঠানে কবিগুরু এক নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা দেন। চন্দননগর মিউজিয়ামে এই অনুষ্ঠানের ছবি-সহ বিস্তারিত বিবরণী, প্রেস রিলিজ ইত্যাদি সযত্নে রক্ষিত আছে।  গুরুদেবের সাথে হরিহরের চিঠিতে যোগাযোগ ছিল বেশ গভীরে। 

লিখেছিলেন ‘প্রাচীন কলকাতা পরিচয়’, যার একটি লাইন সেই সময়ে লোকের মুখে মুখে ঘুরত - ‘জাল জুয়াচুরি মিথ্যে কথা/ এই তিন নিয়ে কলকাতা।’ এছাড়াও লিখেছিলেন 'সংক্ষিপ্ত চন্দননগর পরিচয়', 'মুক্তিসংগ্রামে চন্দননগর', 'অভিশাপ', 'ঘরের কথা', 'প্রতিভা', 'স্রোতের ঢেউ', 'অমৃত গরল', 'পুরাতনী'। তাঁর 'সংক্ষিপ্ত চন্দননগর পরিচয়'-এ সমসাময়িক ফরাসি উপনিবেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবরণ পাওয়া যায়। 

সুধীর কুমার মিত্রের 'হুগলী জেলার ইতিহাস ও বঙ্গ সমাজ' লেখার পিছনেও হরিহর শেঠের ভূমিকা ছিল। সেকথা এই বইটির প্রথম ভাগের প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় সুধীরবাবু স্বীকারও করেছেন। হরিহরবাবু পত্রযোগে সুধীরবাবুকে যথেষ্ট সাহস ও উৎসাহ দিয়েছিলেন।

সাহিত্য ও ইতিহাস চর্চা ছাড়াও চন্দননগরের সামাজিক ক্ষেত্রে হরিহরের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯২৬ সালের ২৬শে জুন চন্দননগরের প্রথম উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন হরিহর শেঠ। মায়ের স্মৃতিতে নাম দেন কৃষ্ণভাবিনী নারী শিক্ষা মন্দির। ফরাসী সরকারের থেকে অনুমতি নেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাধা টপকে এই বিদ্যালয়ের সূচনা করেন হরিহরবাবু। সেই সময় বাংলার প্রেসিডেন্সি ডিভিশনের প্রথম ইংরেজি মাধ্যম উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের বালিকা বিদ্যালয়ও এটি। উদ্বোধনের দিন এসেছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী - তৎকালীন নারী উন্নয়নের প্রখ্যাত মুখ এবং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নী। 

Rabindranath Tagore in Krishna Bhabini Nari Sikhsha Mandir, Chandannagar in 1927 
Source: Website of KBNSM, restored with Google Gemini

পরে ১৯২৭ সালের ৫-মে (২১শে বৈশাখ, ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ) কবিগুরু চন্দননগর এসেছিলেন অক্ষয় তৃতীয়ার উৎসবে প্রবর্তক সংঘের আমন্ত্রণে - সেখানে "বেলা গেল তোমার পথ চেয়ে" গানটি রচনা ও পরিবেশন করেছিলেন। তারপর এই বিদ্যালয়েও আসেন এবং ছাত্রীদের আশীর্বাদ দেন, দক্ষিণের বারান্দায় বসে লিখে ফেলেন, 'বসন্ত যে লেখা লেখে বনে বনান্তরে, নামুক তাহারি মন্ত্র লেখনীর পরে'। পরবর্তীকালে এই বিদ্যালয়ে পদধূলি পড়েছে প্রতিমা দেবী, ইন্দিরা দেবী চৌধুরাণী, কামিনী রায়, আশাপূর্ণা দেবী প্রমুখের।  

প্রথম চার বছর এই বিদ্যালয়ের খরচাখরচ একাই টানতেন হরিহর শেঠ। শোনা যায় এই বিদ্যালয়ের খরচভার খাতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় দুই লক্ষ টাকা। ১৯৩১ সালে তৈরি হয় বিদ্যালয়ের Managing Committee (পরিচালনা পর্ষদ), এবং এখানকার ছাত্রীরা ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা দেওয়ার জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে অনুমতি পায়। পরে ছাত্রী সংখ্যা বাড়লে চন্দননগর পৌরসভা থেকে আরো জমির ব্যবস্থা করা হয়, স্থাপিত হয় তারক দাসী নারী কল্যাণ সদন (১৯৩৩) যা বর্তমানে ছাত্রীদের হোস্টেল। তারক দাসী নারী কল্যাণ সদন উদ্বোধন করেছিলেন ফরাসী ভারতের গর্ভনরের স্ত্রী Madame Juvern। এখানে সেই সময়ে সন্তান লালন-পালন, আত্মীয়স্বজনের রোগ পরিচর্যার জন্য ধাত্রী বিদ্যা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রাথমিক শিক্ষাদান করা হত। 

এই বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষাগত উৎকর্ষের এক ঐতিহ্যের সূচনা হয় ১৯৩২ সালে, যখন দুই ছাত্রী ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়। ১৯৪৩ সালে পরিচালনা পর্ষদের গৃহীত একটি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে বিদ্যালয়টি ফরাসি সরকারের অধীনে একটি সরকারি বিদ্যালয়ে পরিণত হয়। যখন চন্দননগর ভারতের অন্তভুক্ত হয় তখন এই বিদ্যালয়টি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দপ্তরের অধীনে আসে। বর্তমানে এটি একটি সরকারি সাহায্য-প্রাপ্ত বিদ্যালয়। 

মাত্র ৫ জন শিক্ষিকা এবং ৩১ জন ছাত্রী নিয়ে শুরু এই বিদ্যালয় ১০০ বছর পেরেলো, ছাত্রী সংখ্যা এখন দেড় হাজারেরও বেশি। ২০১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষা দপ্তর থেকে ভূষিত হয়েছে জেলার সেরা বিদ্যালয় হিসেবে। ২০১৯ সালের আগষ্ট মাসে এই বিদ্যালয়ের মূলভবনটি হেরিটেজ স্থাপত্যের তকমা পায় পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের থেকে। 

এছাড়া বাবার নামে নৃত্যগোপাল শেঠ প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯২২) এবং কাকার নামে অঘোরচন্দ্র শেঠ অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় (১৯২৫) - দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিনি স্থাপন করেন। ১৩২৮ সালে (ইং ১৯২১-২২) তিনি এবং কালীপ্রসন্ন বসু, মাণিকলাল বড়াল, মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত, প্রিয়নাথ দত্ত সবাই মিলে স্থাপন করেন 'পালপাড়া সুহৃদ সমিতি'। শিক্ষার প্রসার ছাড়াও দুঃস্থ ব্যক্তিদের সাহায্য ইত্যাদি ছিল এই সমিতির কার্যকলাপের অন্তর্ভুক্ত। এই সমিতি একটি ছেলেদের এবং একটি মেয়েদের পাঠশালা চালাত এবং এর অধীনে বালক ও কিশোরদের সান্ধ্য পাঠাগার - 'পালপাড়া বালক সম্মীলন' পরিচালিত হত। ১৯২৯ সালে তিনি স্থাপন করেন একটি গেষ্টহাউস - শম্ভুচন্দ্র সেবাশ্রম যা পরে চন্দননগর পৌরসভাকে দান করেন। 

বাবা নিত্যগোপালের নামে স্থাপন করেন এক থিয়েটার হল সহ গ্রন্থাগার - নিত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির এবং চন্দননগর পুস্তকাগার। চন্দননগরের বাগবাজারে গ্র্যাণ্ড ট্যাঙ্ক রোডের উপর এই প্রসাদপম বাড়িটিকে মিস করা মুশকিল। 

নিত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির এবং চন্দননগর পুস্তকাগার

চন্দননগরের সবচেয়ে পুরনো এবং বৃহত্তম গ্রন্থাগার এই চন্দননগর পুস্তকাগার। এর ইতিহাস শুরু হয় ১৮৭৩ সালে। যদুনাথ পালিত, মহেন্দ্রনাথ নন্দী, মতিলাল শেঠ প্রমুখ মিলে এক শখের থিয়েটার উদ্যোগ গড়ে ওঠে এবং প্রণয়পরীক্ষা নামে একটি নাটক অভিনীতও হয়। যাই হোক এই নাটকের ভূত নামলে নাটকের সরঞ্জাম ইত্যাদি বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ হয় এবং ত্রিগুণাচরণ পালিত, হরিমোহন সুর প্রমুখের সাহায্যে এই গ্রন্থাগার এবং থিয়েটার ক্লাব চলতে থাকে। তবে টাকা পয়সার সমস্যার জন্য বারবার এর ঠিকানা বদলাতে হচ্ছিল। শেষে মুসকিল আসান হিসেবে এলেন হরিহর শেঠ। তাঁর বাবা নৃত্যগোপাল মৃত্যুর আগে শহরের উন্নতিকল্পে পঞ্চাশ হাজার টাকা রেখে গেছিলেন। বাগবাজারে শেঠদের অর্থসাহায্যে ১৯১৫ থেকে ১৯২০-এর মধ্যে তৈরি হল 'নিত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির এবং চন্দননগর পুস্তকাগার'। 

ঐতিহ্য ও ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অনন্য মেলবন্ধন এই বিশাল উত্তরমুখী ইটের ভবনটি। এর চমৎকার গম্বুজ, ইউরোপীয় নব্য-ধ্রুপদী ঘরানার সুউচ্চ করিন্থিয়ান স্তম্ভ এবং হিন্দু রীতির সূক্ষ্ম নকশা এক রাজকীয় আবহ তৈরি করেছে। খিলান ও পিলাস্টারের সুশৃঙ্খল বিন্যাসে সাজানো এর বাইরের অংশ; যেখানে সম্মুখভাগে রয়েছে বিশেষ স্তম্ভের নকশা এবং দুই পাশে চারটি খিলানযুক্ত জানালা। ভবনের ভেতরে পা রাখলেই চোখে পড়ে চমৎকার কারুকার্যে ঘেরা একটি বিশাল হলরুম, যা মূলত সামাজিক সমাবেশের জন্য নির্মিত। এই হলরুমে প্রায় ৭৫০ জনের বসার জায়গা আছে। এছাড়াও একটি বড় ঘর আছে যেটি আসলে বিদেশী ছাত্রদের ডর্মিটরি। শ্রী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ভবনটির উদ্বোধন করেন এবং মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী অনুষ্ঠানটিতে সভাপতিত্ব করেন। এক সময়ে এই হলঘরে এসেছেন এবং বক্তৃতা করে গেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। সেই সময়ে চন্দননগরের যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হত এখানেই।  

সাহিত্যচর্চা এবং শিক্ষাবিস্তার ছাড়াও চন্দননগরের বহুকাজে হরিহর ছিলেন একাই একশো। ১৯১৯ সালে চালের দাম বাড়লে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'চাল-সরবরাহ সমিতি'। ১৯১৮ সালে শহরে ইনফুয়েঞ্জা রোগের প্রকোপ বাড়লে তাঁর উদ্যোগে গঠিত হয় 'চন্দননগর মেডিক্যাল-রিলিফ কমিটি'। তাঁর উদ্যোগে শহরের উত্তর, দক্ষিণ এবং কেন্দ্রে 'শম্ভুচন্দ্র সেবাশ্রম' নামে তিনটি দাতব্য চিকিৎসালয় গড়ে ওঠে। শেষ অবধি অবশ্য এগুলি স্থায়ীভাবে অনুমতি পায়নি, ফলে শহরের কেন্দ্রের শাখাটি ছাড়া বাকিগুলি উঠে যায়। শেষ অবধি এই চিকিৎসালয়টিও অতিথি ভবন-এ পরিণত হয় এবং পৌরসভার অধীনে যায়। এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠনে তিনি অবৈতনিক সম্পাদক ছিলেন - যেমন চন্দননগর স্পোর্টিং ক্লাব, তিলিজাতি হিতৈষী সভা, দশভূজা সাহিত্য মন্দির, গড়বাটি H.E. School, বঙ্গীয় তিলিজাতি সম্মিলনী, হুগলী জেলা ঐতিহাসিক অনুসন্ধান সমিতি, হুগলী কলেজিয়েট স্কুলের রিইউনিয়ন কমিটি (সহপাঠী সমিতি) প্রভৃতি। 

ফ্রান্স সরকার অবশ্য হরিহর শেঠের এই সামাজিক উদ্যোগকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার অনেক আগেই কুর্ণিশ জানিয়েছিল। ১৯৩৪ সালেই ফরাসি সরকার হরিহর শেঠকে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান - Che’valier de Legion d’honneur দিয়ে ভূষিত করে। পরবর্তী সময়ে শিক্ষা ও সমাজে তাঁর গভীর প্রভাবের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘Officier de l’Instruction Publique' এবং ‘Officier d’Académie' উপাধিতেও ভূষিত হন। এর ফলে শুধু স্থানীয় নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও হরিহর শেঠ হয়ে ওঠেন এক সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। এবং তিনি হয়ে ওঠেন ফরাসি ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ ও ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এক সেতুবন্ধন। 

১৯৪৭ সালের ১৫-ই আগষ্ট ভারতবর্ষ স্বাধীন হলেও ফরাসি কর্তৃপক্ষ ভারতের মাটি ছেড়ে যায়নি। চন্দননগরের স্বাধীনতার পথে হরিহর এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার চূড়ান্ত পরিণতি ঘটেছিল ১৯৪৯ সালের ১৯ জুন অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে এবং এর ফলেই চন্দননগরে ফরাসি শাসনের অবসান ঘটে। ১৯৪৭ সালের ২৭ নভেম্বর ফরাসি সরকার চন্দননগরকে ‘মুক্ত শহর’ (Ville Libre) হিসেবে ঘোষণা করে। ফরাসিরা চলে যাওয়ার পর, হরিহর নবগঠিত 'অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কাউন্সিল' বা প্রশাসনিক পরিষদের প্রথম সভাপতি হন; এটিই ছিল চন্দননগরের জনগণের জন্য গঠিত প্রথম প্রকৃত প্রতিনিধিত্বমূলক সংস্থা। এই দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন, যার মধ্যে ছিল নিপীড়নমূলক 'হেড ট্যাক্স' (মাথাপিছু কর) ও সাইকেল কর বাতিল এবং ভাড়া সংক্রান্ত আইন বা 'রেন্টাল অ্যাক্ট'-এর পুনর্গঠন। এছাড়াও তিনি শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ নেন এবং ১লা জানুয়ারি ১৯৪৮ থেকে কার্যকর হওয়ার মতো করে তা নতুনভাবে সাজিয়ে তোলেন। স্থানীয় প্রশাসনের এই পর্বটি ১৯৫০ সালের ২রা মে পর্যন্ত চালু ছিল; ওই দিনই চন্দননগর আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। 

চন্দননগর মিউজিয়ম গঠনেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। মিউজিয়ামের প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহ হরিহর শেঠেরই করা। এর মধ্যে অষ্টম শতকের বুদ্ধমূর্তি এক অমূল্য সংগ্রহ। 

হরিহর শেঠের ভাই দুর্গাদাস শেঠ (জন্ম ২০ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৫ - মৃত্যু ২০ জুলাই ১৯৫৮) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব এবং অগ্নিযুগের বাঙালি বিপ্লবী।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পরে দুর্গাদাস লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারে 'শিল্প সমবায়' নামে একটি ছোট দোকান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যেখানে তিনি দেশীয় হস্তশিল্প, তাঁতের কাপড়, খাদি, দেশীয় ওষুধ এবং প্রসাধনী বিক্রি করতেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত আয় সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য পরিচালিত হয়েছিল। কালীচরণ ঘোষ, তিনকড়ি মুখোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, সন্তোষ নন্দী, আনন্দ পাল প্রমুখ তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। এই শিল্প সমবায়ের থেকে লাভের টাকাপয়সা মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন কাজে খরচ হত। উল্লেখযোগ্য হল তিনি এই ফাণ্ড থেকে দশহাজার টাকা নিয়ে দিয়েছিলেন অরবিন্দকে, পরে পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে বিপ্লবী শ্ৰীশচন্দ্ৰ ঘোয়ের নামে ‘শ্ৰীশ ফান্ড’ প্ৰতিষ্ঠা করে তা ট্রাস্টির হাতে দেন। 

দুর্গাদাস 'স্বদেশী বাজার' নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাও চালু করেন যেখানে তিনি আধ্যাত্মিক, ধর্মীয় ও বিপ্লবী নিবন্ধগুলির পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন ও ইতিহাস প্রকাশ করেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার  রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যা অভিযোগে দুর্গাদাসকে আলিপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী করে। কারাগারে থাকাকালীন তিনি যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এবং সুভাষচন্দ্র বসুর মতো উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। শেষের দিকে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে প্ৰাপ্ত এক লক্ষ টাকা পণ্ডিচেরী আশ্রমে দান করে তিনি শ্ৰীঅরবিন্দের কাছে আত্মসমর্পণ-যোগ গ্রহণ করেছিলেন। গুরুদক্ষিণা দিয়ে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় কলিকাতায় বিজয়কৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের আশ্রয়ে থাকতেন। 

দেশশ্রী হরিহর শেঠের বাড়ি - এটি এখন একটি Heritage Property। 

হরিহর শেঠের এই বাড়ির ইতিহাস আগেই বলেছি। হরিহরের ঠাকুরদা শম্ভুচন্দ্রের শ্বশুরমশাই এই পালপাড়ার বাড়িটি দিয়েছিলেন। বাড়িটি প্রথমে দ্বিতল ছিল। পরে হরিহর শেঠ বাড়িটিকে বিস্তৃত করে নতুন অংশে তিনতলা যুক্ত করেন। 

এই বাড়িটিতে দুর্গাপুজো শুরু হয় শম্ভুচন্দ্রের আমলেই। আজও এই পুজো নিষ্ঠা সহকারে করে চলেছেন শেঠ পরিবারের সদস্যরা। এই দুর্গাপুজো দেখতে শেঠবাড়ি এসেছেন শরৎচন্দ্র চট্ট্যোপাধ্যায়, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়, জগদীশ চন্দ্র বসু। তবে এই দুর্গাদালান অন্য সময়ে অন্য ভূমিকা নিত। এই দুর্গাদালানে বাড়ির মহিলারা বিপ্লবীদের জন্য খাবার রেখে আসতেন। তাঁরা তাঁদের সুবিধামত এসে এই খাবার খেয়ে যেতেন।

সাবেকি মতে ডাকের সাজে মায়ের স্নিগ্ধ মূর্তি এই পুজোর বৈশিষ্ট্য। পুজোর উপকরণ জোগাড় করা এবং নৈবেদ্য সাজানো সবই করেন বাড়ির মহিলারা। হরিহর শেঠের বংশধর গৌতম শেঠ জানান, তৎকালীন সমাজে পর্দাপ্রথা ছিলো বাড়ির মহিলাদের। তাই অনেক কিছু বিধি-নিষেধ ছিল। হরিহর শেঠ ছিলেন মুক্ত মনের মানুষ। তিনি ঠিক করেছিলেন বাড়ির মহিলারাই থাকবেন এই দুর্গাপুজোর পুরোভাগে। তারপর থেকে পুজোর আচার আয়োজন বাড়ির মহিলারা করতেন। সিঁদুর খেলার জন্যও বিখ্যাত এই পুজো। অষ্টমীতে হত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। রেওয়াজ ছিল বিসর্জনের দিন জেলেরা এসে মাকে কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে গঙ্গায় বিসর্জন দেবেন। তবে একালে আর ওই নিয়ম চলে না, স্থানীয় লোকেরাই কাঁধে করে নিয়ে গিয়ে প্রতিমা নিরঞ্জন করেন। 

হরিহর শেঠের পরবর্তী প্রজন্মঃ

হরিহরের পুত্র ছিলেন মনোরঞ্জন। তাঁর সাথে বিয়ে হয় চন্দননগরের হাটখোলার বাসিন্দা সত্যচরণ নন্দীর কন্যা দুর্গাবতীর সাথে। মনোরঞ্জন-দুর্গাবতীর দুই পুত্র - উমানাথ এবং শিখরনাথ। 


তথ্যসূত্রঃ

https://klvmcgr.co.in/sri-harihar-sett/
https://heritagechandernagoreblog.wordpress.com/2016/01/19/the-chronicles-of-the-sett-family-of-chandernagore/
https://debdeepg.wordpress.com/2024/11/14/harihar-seth-a-businessman-a-litterateur-a-philanthropist/
https://bn.wikipedia.org/wiki/হরিহর_শেঠ
https://bn.wikipedia.org/wiki/দুর্গাদাস_শেঠ
https://krishnabhabininarisikshamandir.com/history/
https://krishnabhabininarisikshamandir.com/wp-content/uploads/2023/10/april-2022_compressed.pdf
https://www.anandabazar.com/rabibashoriyo/bengali-tradition-of-scam/cid/1290737
https://kulayefera.com/পার্বণী-১৪২৯/শম্ভুচন্দ্র-শেঠ-অনির্বা/
https://eisamay.com/retrospective/article-on-durgacharan-rakkhit-harihar-sheth-and-satyendra-ghosh-by-arup-ganguly/49351466.cms
Discover Chandannagar by Dr. Ajit Kumar Mukhopadhyay & Kalyan Chakraborty (1999) - https://www.scribd.com/document/325310014/Discover-Chandernagore
https://www.itihasadda.in/chandannagar/
https://sahityika.in/2023/10/14/চন্দননগর-একদিনের-ছুটিতে/
https://bangla.asianetnews.com/life/know-about-the-untold-facts-of-the-durga-puja-of-harihar-seth-s-house-in-chandannagar-bdd-qi6pi1/articleshow-2g42z5
পণ্ডিত শ্রীশিবেন্দ্রনারায়ণ শাস্ত্রীর বাঙ্গালার পারিবারিক ইতিহাস - প্রথম খণ্ড-হুগলী জেলা
সুধীরকুমার মিত্র-র হুগলী জেলার ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড)

No comments: