Thursday, September 17, 2026

চন্দননগরের রেজিস্ট্রি বাড়ি এবং চন্দননগর ফেস্টিভ্যাল (২০২৬)

এই বছর সেপ্টেম্বরের ১১ থেকে ১৩ তারিখ চন্দননগরে হয়ে গেল এক অভিনব উৎসব - দ্য চন্দননগর ফেস্টিভ্যাল। এই উৎসবের মূল বিষয়বস্তু ছিল ষ্ট্র্যাণ্ড রোডের ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক ‘রেজিস্ট্রি ভবন’-এর সংস্কার এবং উৎসবের প্রথম দিন ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ধ্যাটির নামকরণ করা হয় ‘দ্য রেজিস্ট্রি’ (The Registry) । 

ফরাসি আমলের একসময়ের জমকালো রেজিস্ট্রি অফিসটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। এর ভাঙা জানালা ও বেরিয়ে থাকা লাল ইটের দেয়ালগুলো বটগাছের ঘন ঝুরি ও শিকড়ে এতটাই ভরে গেছে যে মনে হয় পুরো কাঠামোটিই যেন বটগাছগুলোর ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে।

Registry Building, Chandannagar (2022)

১৮৭৫ সালে চন্দননগরে ফরাসি শাসকদের নির্মিত এই ভবনটি একসময় আদালত ও মূল প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বস্তুত, এই ঔপনিবেশিক শহরের প্রথম আদালত ভবন ছিল এটিই। ঊনবিংশ শতাব্দীর ফরাসি স্থাপত্যরীতির অপূর্ব নিদর্শন এই ‘রেজিস্ট্রি ভবনটি’ ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে তৈরি। বিশাল বারান্দা, সমতল ছাদ এবং দোতলায় ফরাসি ধাঁচের সুদৃশ্য জানালা এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

The Registry Building (2026)

বেহাল অবস্থা

বেহাল অবস্থা

Registry Building, Chandannagore (2026)

ফরাসি আমলে চন্দননগরবাসীর প্রাত্যহিক জীবনে 'রেজিস্ট্রি ভবনটি' বিশেষ গুরুত্ব বহন করত। অসংখ্য মামলা রুজু করা থেকে শুরু করে বিবাহ নথিভুক্তকরণ—সবই হতো এই ঐতিহাসিক ভবনে।

রেজিস্ট্রি বাড়ির সামনে মূল অনুষ্ঠান মঞ্চ (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

আলোয় আলোয়, রেজিস্ট্রি বাড়ির সামনে মূল অনুষ্ঠান মঞ্চ (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)

পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন (WBHC) ২০১৭ সালেই এই বাড়িটিকে হেরিটেজ স্থাপত্যের তকমা দেয়। তখনই বলা হয়েছিল যে এই বাড়িটির 'Urgent Restoration' দরকার। এরপর দিল্লির ঐতিহাসিক স্থাপত্য সংস্কার এবং রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থা ‘ঐশ্বর্য টিপনিস আর্কিটেক্টস’ (Aiswarya Tipnis Architects) কলকাতায় অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসের সহযোগিতায় এই ঐতিহাসিক কাঠামোটি মেরামতের জন্য একটি ‘Crowd-funding' উদ্যোগ নেয়। Bonjour India Project-এর এর তৃতীয় সংস্করণের একটি অংশ ছিল এই ক্রাউড-ফাণ্ডিং উদ্যোগটি। এর ফলে ভবিষ্যতে চন্দননগরের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থাপত্যগুলির সংস্কারের কাজ শুরু করতে সুবিধা হবে।

প্রকল্পটিতে এক বছর ধরে কাজ চলার পর, ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশনের চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিল্পী শুভাপ্রসন্ন এবং ফরাসি রাষ্ট্রদূত Alexander Zeigler যৌথভাবে ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটির স্মারক ফলক উন্মোচন করেন। ক্রাউড ফাণ্ডিং ছাড়াও এই সংস্কারের কাজে ফ্রান্স নিজে থেকে টাকা দেবে বলে ঠিক হয়। ফ্রান্স সরকারের তরফ থেকে এই কাজের জন্য পণ্ডিচেরি সরকারের প্রাক্তন পরামর্শদাতা Raphael Gastebois-কে নিয়োগ করা হয়। সেই সময় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং ফরাসি সরকারের মধ্যে এই সংস্কারকাজের জন্য ত্রিশ মাসের একটি মৌ (MoU অর্থাৎ Memorandum of Understanding) স্বাক্ষরিত হয়। Virginie Corteval (French Consul of Kolkata), Fabrice Plançon (Director of Alliance Francaise du Bengale), Alice Brunot (French cultural official) সহ বেশ কিছু লোকজন মিলে একটি দল গঠন করা হয়। কাঠামোটি মেরামত এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের উপায় নিয়ে বিশদ পর্যালোচনার পর, পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতিরা ভবনটিতে একটি বুটিক হল, একটি কফি শপ এবং একটি লাইব্রেরি গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। তবে ২০১৯-এর শেষ থেকে কোভিড মহামারি শুরু হলে এই কাজ প্রায় থেমেই যায়।

২০২১ সালে মহামারির শেষে ২২শে জুন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন বিভাগের তৎকালীন প্রধানসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং ফ্রান্স সরকারের তরফে ফরাসি কনসাল জেনারেল Virginie Corteval চন্দননগরের ‘চাঁদের বাড়ি’ (রেজিস্ট্রি বিল্ডিং) পুনরুদ্ধারের মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়ে একটি MoU স্বাক্ষর করেন (WB Tourism tweeted on X)। যদিও বিভিন্ন কারণে কাজের কাজ কিছুই শুরু হয়নি। ক্রাউড ফাণ্ডিং উদ্যোগটিও ঠিকঠাক চলেনি, যদিও অনেকেই মনে করেন এই প্রজেক্টের ব্যাপারে শহরের মানুষের কাছে ভালোভাবে পৌঁছানোই যায়নি।

প্রসঙ্গত এর আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ডেনমার্কের জাতীয় জাদুঘরের সাথে যৌথ উদ্যোগে একটি জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার করেছিল, যা ঔপনিবেশিক আমলে একটি 'ট্যাভার্ন' (পানশালা ও সরাইখানা) হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আমূল সংস্কারের পরে নতুন রূপে সজ্জিত এই 'ডেনমার্ক ট্যাভার্ন'টি বর্তমানে কলকাতার একটি বেসরকারি হোটেল গোষ্ঠী (পার্ক হোটেল) হোটেল ও রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচালনা করছে।

২০২৬ সালে এপ্রিলে রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদল হলে রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী হন ডঃ শঙ্কর ঘোষ। মূলত তাঁর উদ্যোগেই এই বছর শুরু হল চন্দননগর উৎসব। মূল আলোচ্য কিন্তু রেজিষ্ট্রি বাড়ির ঐতিহ্যবাহী সংস্কার এবং এই উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে পাশে টানা।

এই শহরের জগদ্ধাত্রী পুজোর আলোকসজ্জা বা যাকে বলি লাইটিং খ্যাতি বিশ্বজোড়া, তা মেনেই এই উৎসবে স্ট্র্যাণ্ড রোড এবং স্যাক্রেড হার্ট গির্জাকে সাজিয়ে তোলা হয়েছিল আলোয় আলোয়। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস-এর মত করেই চন্দননগর সেজে উঠেছিল।

Strand Road of Chandannagar

Lights on Strand Road, Chandannagore

এই উপলক্ষে চন্দননগরে উপস্থিত ছিলেন ফরাসি রাষ্ট্রদূত Thierry Mathou এবং ফরাসি সরকারের (কলকাতায় অবস্থিত ফ্রান্সের কনস্যুলেট জেনারেল) প্রতিনিধিরা। এছাড়া প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঙ্গা আরতি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হয়েছিল। তিন দিন ধরে স্ট্র্যান্ড রোডের দুপাশে বিভিন্ন খাবারের স্টল বসানো হয়েছিল, যেখানে ভারতীয় খাবারের পাশাপাশি ফরাসি ও অন্যান্য কন্টিনেন্টাল খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। 

এই অনুষ্ঠান উপলক্ষে চন্দননগরের MLA দীপাঞ্জন গুহ বলেছেন, “Chandannagar has a rich history and culture, as well as numerous architectural heritage sites. These must be protected. Chandannagar was also once a place where revolutionaries took shelter in secrecy. Chandannagar has a deep emotional and historical connection with France, and we have taken this initiative to strengthen that bond further.”

রাজ্য সরকারের একটি পরিকল্পনা রয়েছে এই অঞ্চলের গঙ্গানদীবর্তী প্রাক্তন ইউরোপীয় বসতিগুলিকে—যার মধ্যে রয়েছে ব্যারাকপুর, শ্রীরামপুর, চন্দননগর, চুঁচুড়া ও ব্যান্ডেল—নিয়ে একটি পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার; এই এলাকাগুলোকেই প্রায়শই ‘গঙ্গার ধারে লিটল ইউরোপ’ বা ‘ছোট ইউরোপ’ বলে অভিহিত করা হয়। উল্লেখ্য, এই শহরগুলো যথাক্রমে ব্রিটিশ, ডেনিশ, ফরাসি, ডাচ ও পর্তুগিজ—বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশের উপনিবেশ ছিল। 

তথ্যসূত্রঃ
https://www.aishwaryatipnisarchitects.com/work/registry-building-chandernagore
https://www.aishwaryatipnisarchitects.com/work/french-colonial-town-chandernagore
https://heritagechandernagore.com/

No comments: