Pages

Wednesday, May 15, 2024

Gopinath Saha

গোপীনাথ সাহাকে বাদ দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে শ্রীরামপুরের অবদান লেখা যায় না। গোপীনাথের জন্ম বরানগরে - ১৯০৫ সালের ১৬ই ডিসেম্বরে। এর কিছুদিন আগেই ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জনের আদেশে বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। এর ফলে সেই সময়ে বাংলায় এক প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। যারা ধর্মকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তারা কেউই বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন জানাননি। কেননা, বঙ্গভঙ্গের অন্যতম একটি কারণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের ‘বিভক্ত ও শাসননীতি' (Divide and Rule Policy), পরবর্তীতে যাতে তারা সফল হয়।

১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ার রাজধানী কলকাতা থেকে চলে আসে দিল্লীতে। 

গোপীনাথের জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর পরিবার চলে আসে শ্রীরামপুরের অক্সফোর্ড স্ট্রীটে। গোপীনাথের বাবা ছিলেন বিজয় কৃষ্ণ সাহা, মা সুরবালা দেবী। গোপীনাথ বা গোপীমোহন ছিলেন চার ভাইয়ের মধ্যে তৃতীয়। প্রাথমিক শিক্ষা শ্রীরামপুর হাই স্কুলে হলেও পরে গোপীনাথ ভর্তি হন হুগলী বিদ্যামন্দিরে। সেই সময়ে হুগলী বিদ্যামন্দির ছিল বিপ্লবীদের কাজকর্মের অন্যতম কেন্দ্র। ফলে স্বাধীনচেতা গোপীনাথ ১৫-১৬ বছর বয়সেই ব্রিটিশ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি আকৃষ্ট হন। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং ইংরেজ সরকারের দম্ভ ও নিপীড়নের যোগ্য জবাব দিতে গোপীনাথ বাড়ী ছাড়লেন। হুগলী বিদ্যামন্দির,কলকাতার শ্রী সরস্বতী লাইব্রেরী ও সরস্বতী প্রেস, দৌলতপুর সত্যাশ্রম, বরিশালের শঙ্কর মঠ, উত্তরপাড়া বিদ্যাপীঠ প্রভৃতি জায়গায় বিভিন্ন বিপ্লবী নেতাদের নির্দেশে কাজ করতে শুরু করলেন গোপীনাথ, অসহযোগ আন্দোলনের সময় বিদ্যালয় ত্যাগ করলেন এবং বিভিন্ন সেবামূলক কাজে নিজেকে সমর্পণ করলেন কিশোর গোপীনাথ। এই সময় তাঁর শিক্ষক অধ্যাপক জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষের গ্রেপ্তার গোপীনাথের মনে তীব্র যন্ত্রনার সৃষ্টি করে। গোপীনাথের অস্থির মন কিছুতেই শান্ত হয় না যে, আসল কাজ না পাওয়া পর্যন্ত এই ছটফটানি থেকেই যাবে। অবশেষে বহু প্রতীক্ষার পর গোপীনাথ পেলেন মনের মতো কাজ, কলকাতার বিপ্লবী হরিনারায়ণ চন্দ্রের পরিকল্পনা মত নির্দেশ এল কলকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টকে হত্যা করতে হবে, যিনি বিপ্লবীদের উপর অকথ্য নিপীড়ন চালিয়ে কুখ্যাতি অর্জন করেছেন ইতিমধ্যেই। শুরু হলো টেগার্টের উপর নজর রাখা এবং গোপীনাথের টার্গেট প্র্যাকটিস।

চার্লস টেগার্ট ১৯০১ সালে কলকাতা পুলিশে যোগ দেন, ১৯১৮ সালে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ডিআইজি হন, এবং ১৯২৩ থেকে ১৯৩১ অবধি কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বেই ব্রিটিশ পুলিশ ১৯১৫ সালে বালেশ্বরের যুদ্ধে বাঘা যতীন এবং তাঁর সঙ্গীদের হত্যা করেছিল। ভারতীয়দের উপর ভয়ানক অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত ছিল এই আইরিশ পুলিশকর্তা। ঔপনিবেশিক পুলিশদের মধ্যে যে গুণগুলি থাকা দরকার, যেমন "muscle over brains, quiet and intimidating demeanour, and bullheaded loyalty" - এর সবকটিই এর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।   

গোপীনাথ খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন যে টেগার্ট সাহেব থাকেন ২ নং কিড স্ট্রীটে। সেখানকার পুলিশ পাহারা ছিল দুর্ভেদ্য। তাই তিনি পরিকল্পনা করলেন সকালবেলা ময়দানে যখন টেগার্ট সাহেব প্রাতঃভ্রমণে আসেন, তখন তাঁকে হত্যা করার। কারণ এই সময় তিনি দেহরক্ষীহীন অবস্থায় থাকেন। অবশেষে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ১২ই জানুয়ারি কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের সকালে গোপীনাথ বেরোলেন টেগার্টের খোঁজে। আশ্চর্য ঐতিহাসিক সমাপতন। ১২ই জানুয়ারি ছিল সশস্ত্র সংগ্রামের অন্যতম অনুপ্রেরণাদানকারী স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন। গোপীনাথের পরনে ছিল ধুতি আর খাঁকি জমা, পকেটে গুলি ভরা রিভলবার। তিনি হঠাৎ দেখলেন রাস্তার পশ্চিম দিক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক সাহেব। ১৯ বছরের তরুণ গোপীনাথ তাঁকেই চার্লস টেগার্ট মনে করে চালিয়ে দিলেন গুলি। দুর্ভাগ্যবসত গুলি চালানোর পর গোপীনাথ পালাতে পারেননি, ভিড়ের মধ্যে তিনি ধরা পড়ে যান। তবে ধরা পড়লেও লক্ষ্য পূরণ হয়েছে বুঝে তিনি মনে মনে শান্ত থেকে ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে ক্ষুদিরাম বোস ও প্রফুল্ল চাকীর মত লক্ষ্যভেদে ভুল হয়েছিল তাঁরও। গোপীনাথ ভুল করে টেগার্টকে না মেরে কিড কোম্পানীর অধিকর্তা আর্নেষ্ট ডে [Ernest Day] নামের এক সাহেবকে মেরে বসেন। 

এই প্রসঙ্গে ১৩ই জানুয়ারী ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয়ঃ 
চৌরঙ্গীতে হুলুস্থূল : বাঙ্গালী যুবকের গুলীতে ইউরোপীয় আহত 
গতকল্য সকালবেলা পার্ক স্ট্রীট ও চৌরঙ্গী রোডের মোড়ে একজন বাঙ্গালী যুবক জনৈক ইউরোপীয় ভদ্রলোক ও তিনজন মোটর চালককে লক্ষ্য করিয়া গুলী ছোড়ে। যুবকটির নাম এখনও জানা যায় নাই। যুবকটিকে গ্রেপ্তার করিয়াই পুলিশ তাহার পকেট খানাতল্লাস করিয়া একটি পিস্তল ও কিছু অব্যবহৃত টোটা বাহির করে। প্রকাশ যে, গতকল্য ৫৷৷ টার সময় হাসপাতালে মিঃ ডের মৃত্যু হইয়াছে।

Report by Reuter


লালবাজারে তাঁর মুখোমুখি হলেন টেগার্ট। ভুল বুঝতে পারলেন গোপীনাথ, সে আফসোস তিনি ভুলতে পারেননি নিশ্চয়। এই সময়ে আনন্দবাজার পত্রিকাতে 'চৌরঙ্গী হত্যাকান্ড' শিরোনামে এই মামলার বিবরণ এবং গোপীনাথের নির্ভীক বক্তব্য প্রকাশিত হত। আদালতে দাঁড়িয়ে গোপীনাথ স্বীকার করেন যে ভারতের মুক্তি সংগ্রামের বিষাক্ত কাঁটা টেগার্ট সাহেবকে তিনি হত্যা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেশ ও জাতির শত্রুকে হত্যা করার পরিবর্তে তাঁর মতো দেখতে এক নির্দোষ সাহেবকে তিনি হত্যা করেছেন। তিনি আদালতে টেগার্টের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হেসে বলেন যে টেগার্ট সাহেব হয়তো ভাবছেন যে তিনি নিরাপদ, কিন্তু তাঁর আরম্ভ করা কাজ পূর্ণ করার জন্য ভারতবর্ষে অসংখ্য তরুণ আছে। এই মামলাতে আরো অনেক বিপ্লবী জড়িয়ে পড়তে পারতেন। কিন্তু সাহসী গোপীনাথ সমস্ত দোষ নিজের কাঁধে তুলে নেন এবং অন্যদের আড়াল করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পরামর্শে বেশ কয়েকজন আইনজীবী গোপীনাথের পক্ষে সওয়াল করেন, কিন্তু গোপীনাথের নির্ভীক এবং সুস্পষ্ট স্বীকারোক্তির কারণে তাঁদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অবশেষে গোপীনাথের প্রাণদণ্ডের আদেশ হয়। আদালতে নিরীহ ব্যক্তিকে হত্যা করিবার জন্য তিনি মর্মস্পর্শী ভাষায় দুঃখ প্রকাশ করেন। প্রাণদণ্ডের আদেশ শুনে গোপীনাথ বলেছিলেন, ''আমার রক্তের প্রতি বিন্দু যেন ভারতের ঘরে ঘরে স্বাধীনতার বীজ বপন করে।'' মা সুরবালাকে শেষ চিঠিতে গোপীনাথ লিখলেন "আমার জননীর মতো প্রত্যেক জননী যেন গোপীনাথের মতো সন্তানের জন্ম দেন "।

১৯২৪ সালের ১ মার্চ গোপীনাথ সাহার ফাঁসি হয় আলিপুর জেলে। জেল থেকে তাঁর দেহ আনতে গেছিলেন স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বসু নিজে। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার গোপীনাথের দেহ কাউকেই এমনকি গোপীনাথের পরিবারকেও দেয়নি। তাদের ভয় ছিল যে এই দেহ নিয়ে মিছিল বের হলে শহরের আইন শৃঙ্খলা নষ্ট হবে, এবং গোপীনাথের মত আরো অনেক তরুণ এই রকম খুনখারাপিতে জড়িয়ে পড়বে। কলকাতার হরিশ পার্কে গোপীনাথের শোক সভা আয়োজিত হয়। সুভাষচন্দ্র গোপীনাথের উত্তরীয় মাথায় বেঁধে সেই শোক সভায় আগুনঝরা বক্তৃতা করেন এবং পরদিনই তিনি গ্রেফতার হন।

গোপীনাথ সাহার মামলার পরে কলকাতার ইউরোপীয় সমাজে বেশ ভালো রকম ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু তার সাথে সাথে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসেও ফাটল ধরার উপক্রম হয়। মাত্র আঠেরো বছরের স্বল্প জীবনে গোপীনাথ যে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের অপূর্ব দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন, সারা দেশে সর্বত্রই গোপীনাথের স্মরণে শোকসভা পালিত হল। উলটো দিকে অহিংসনীতির প্রচারক গান্ধী আর্নেষ্ট ডে'র মৃত্যুতে দুঃখপ্রকাশ করে কঠোর ভাষায় শহীদ গোপীনাথের সমালোচনা করলেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ গোপীনাথের দেশপ্রেমের উল্লেখ করে সিরাজগঞ্জে জাতীয় সম্মেলনে এক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। ফলে জাতীয় কংগ্রেসে গান্ধী বনাম দাশ (এবং সুভাষ) দ্বন্দ্বের উদ্ভব হয়। শেষ অবধি গান্ধীই কংগ্রেসের দখল নেন - কারণ ছিল ১৯২৫ শে ১৬ই জুন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের মৃত্যু এবং ১৯৩৯-এ সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর সুভাষচন্দ্র ১৯৪১ এর ১৬ই জানুয়ারি গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় পালিয়ে জার্মানি পৌঁছান। পরের গল্প মোটামুটি সবার-ই জানা। এই নিয়ে আর বিশদে যাচ্ছি না। 

এতৎ সত্ত্বেও বর্তমান প্রজন্ম অগ্নিযুগের শহীদ গোপীনাথ সাহাকে চেনে না, এ বড় দুঃখের ব্যাপার। তবে রাজ্য সরকারের তরফে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে - শ্রীরামপুরের ফ্লাইওভারটির নাম গোপীনাথ সাহা উড়ালপুল। শ্রীরামপুরের রেলষ্টেশন সংলগ্ন একটি বাজারের নাম রাখা হয়েছে গোপীনাথ সাহা মার্কেট। আর কলকাতায় ২৫শে ডিসেম্বরে মানুষজন ভিড় করে পার্ক স্ট্রীটে হেঁটে হেঁটে অ্যালেন পার্ক অবধি যায়, সেই অ্যালেন পার্কের নাম এখন গোপীনাথ সাহা উদ্যান। যদিও 'অ্যালেন পার্ক' লেখাটি এখনো পার্কের দরজায় বিদ্যমান। 

শেষে অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের অবদান সম্পর্কে সম্মান জানিয়ে একটি গানের কয়েকটি লাইন এই পোস্টে রাখলাম - 

"মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান
‎লেখা আছে অশ্রুজলে

কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
তাঁরা কি ফিরিবে আজ
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সুপ্রভাতে 
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে"

প্রসঙ্গত এই গানটি লিখেছিলেন মোহিনী চৌধুরী, মূলত ১৯৪২ সালের 'ভারত ছাড়' আন্দোলনের সময় ও পরবর্তী ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে। পরে ১৯৪৩-৪৪-এ এই গানটিতে সুর দেন গায়ক কৃষ্ণচন্দ্র দে। 


তথ্যসূত্রঃ
https://hinduvoice.in/freedom-fighter-gopinath-saha/
https://www.livehistoryindia.com/story/people/gopinath-saha-case
https://www.getbengal.com/home/story_detail/a-martyr-at-19-the-man-who-almost-killed-charles-tegart
https://en.wikipedia.org/wiki/Gopinath_Saha
https://cpimwestbengal.org/in-respect-and-remembrance-on-the-day-of-execution-death-gopinath-saha
https://www.anandabazar.com/west-bengal/kolkata/death-centenary-of-freedom-fighter-gopinath-saha-will-be-observed-on-wednesday-in-kolkata/cid/1410791
কলকাতা পুরশ্রীঃ ১৬ই মার্চ ২০২৪ সংখ্যা 

No comments: