আগেই বলেছি যে কলকাতা থেকে ২৫-৫০ কিলোমিটার দূরত্বে হুগলী নদীর ধার ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল একাধিক ইউরোপীয়ন বাণিজ্যকেন্দ্র তথা উপনিবেশ - বারাকপুরে ব্রিটিশরা, উল্টোদিকে শ্রীরামপুরে ড্যানিশরা, তার উত্তরে চন্দননগরে ফরাসীরা, চুঁচুড়াতে ডাচ বা ওলন্দাজরা, এবং ব্যাণ্ডেলে পর্তুগীজরা।
আজকের গল্প চুঁচুড়া ফেরিঘাটের একটু উত্তরে ঘণ্টাঘাট নিয়ে। এই ঘাটে কি ঘণ্টা ছিল? কোথায় গেল সেই ঘণ্টা?
১৬০২ সালে ডাচরা গঠন করে De Vereenigde Oostindische Compagnie (VOC) অর্থাৎ “ইউনাইটেড ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” (United Dutch East India Company) - যার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্য সম্প্রসারণ। ১৬০৪ সালে ডাচেরা মালাবারে পা রাখে। আরো পরে তিনটি জাহাজ নিয়ে ১৬২২ সালে হুগলী অঞ্চলে ঘুরে যায় তারা। তবে ১৬৩৮ সালে মোগল সম্রাট শাহজাহানের ফরমান নিয়ে ডাচেরা এই হুগলী-চুঁচুড়ায় স্থিতু হয়।
1742 সালে চুঁচুড়ার ডাচ আধিকারিক Jan Albert Sichterman একটি চার্চের সূচনা করেন, মূল মিনারটি (tower) তাঁর আমলেই গঠিত হয়। 1744-এ এই মিনারটির উপরে বুরূজটি (steeple) এবং ঘন্টা ঘড়িটি (Belfry) প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও Sichterman এই চার্চের প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারেননি। তাঁর উত্তরসূরী Sir Goerge Vernet এই চার্চের স্থাপন করেন 1767-তে (বা 1785-এ)। এই মিনারটি প্রায় 40 ফুট উচুঁ ছিল।
![]() |
| The Church, Ghantaghat and 'Residence of a Rich Baboo' (now the Mohsin College), by Marianne Jane James (1828) | British Library |
তবে চার্চ গঠন হলেও এখানে কোন পাদ্রী (clergyman) নিযুক্ত ছিলেন না, বরং সেদিক থেকে ভাবলে শুরুর দিকে ডাচরা ধর্ম নিয়ে অতটা উৎসাহী ছিলেন না। চার্চে প্রার্থনা করানোর জন্য ডাকা হত zekentrooster-কে (comforter of the sick, not from a holy order), বিশিষ্ট অনুষ্ঠানে কলকাতা থেকে কোন পাদ্রীবাবাকে ভাড়া করে আনা হত।
![]() |
| Johann Zachariah Kiernander |
তবে কিরনান্দের সাহেব যখন চুঁচুড়াতে এলেন, তখন তিনি তাঁর জীবনের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে এসেছেন। 77 বছর বয়স তখন, চোখেও কম দেখতে পান, কলকাতা বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে অর্থকষ্ট ভুগছেন - এই ঘণ্টা গির্জার চ্যাপলিন হিসেবে ছিলেন 1795 অবধি, মাসে পেতেন 25 টাকা। 1795-তে ইংরেজরা কিছু সময়ের জন্য চুঁচুড়ার দখল নেয়, কিরনান্দের হয়ে যান ডাচ যুদ্ধবন্দী, তবে এই সময়ে মাসে 50টাকা করে পেতেন তিনি। 1799-তে তিনি ফেরত যান কলকাতাতে, এবং সেই বছরেই কলকাতাতেই 89 বছর বয়সে মারা যান।
1821 সালে নেদারল্যাণ্ড মিশনারী সোসাইটি থেকে চুঁচুড়া এসেছিলেন Rev Francis Lacroix, তাঁর লেখায়, “The church, an antiquated building, of no definite style of architecture, stood… on the bank of the river. Its tower alone was built first to bear the settlement clock; the part adapted for worship being added twenty-five years after…”
এই গির্জার উচু চূঁড়া নিয়ে একসময়ে এক মজার কবিতা লোকের মুখে মুখে ঘুরত - "কে বলে রে জটাইবুড়ি গিয়েছিল বৃন্দাবন/ ঘন্টাঘাটের গির্জে দেখে বলে গিরি গোবর্ধন।"
1825 সালে চুঁচুড়া ব্রিটিশ অধীনে এলে এই চার্চটি কলকাতার বিশপের অধীনে চলে যায়। এতদিন ধরে এই চার্চটি স্থানীয় ডাচম্যান এবং মিশনারীদের প্রার্থনা এবং মিশনারীর কাজে ব্যবহৃত হত বলে এই চার্চটি তাদের কাছে খুব কাছের একটি জিনিস ছিল। ফলে এই পরিবর্তন স্থানীয় ডাচম্যান এবং মিশনারীদের কাছে খুবই দুঃখের ব্যাপার ছিল। রেভারেণ্ড Lacroix লিখেছেন, “The station having passed to the English Government; the church was handed over to the Established Church of England. The missionaries, who had gratuitously supplied religious instruction within its walls for twenty years, ceased their ministrations; and the Dutch inhabitants, and others, were compelled to leave a building which they regarded as their own…”
ডাচদের বানানো ফোর্ট গুস্তাভাস ভেঙ্গে ফেললেও এই চার্চটি ব্রিটিশরা ব্যবহার করতে শুরু করে। ১৮৬৪ সালের ৫-ই অক্টোবর এক সাইক্লোনে এই চার্চটির ঘণ্টাসহ চূড়াটি ভেঙ্গে পড়ে। এবং এর পর থেকেই এই চার্চের প্রতি অবহেলা শুরু হয়। কারণ ১৮২৫ সালে ব্রিটিশরা আজকের ঘড়ির মোড়ে একটি ফ্রি চার্চ গড়ে তোলে। পরে এটি United Church of North India-এর অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং আরো পরে ১৯৭০-এর দশকে চার্চ অফ নর্থ ইণ্ডিয়ার (C.N.I. or Church of North India) অন্তর্ভুক্ত হয়।
যাই হোক ১৯৫০-এ UCNI ঘণ্টাঘাটের চার্চটিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে বিক্রি করে দেয়, কারণ it was “no longer required”। এর ঠিক আগেই, ভারতের স্বাধীনতার পর, অবশ্য এই চার্চে থাকা বিভিন্ন ডাচ গর্ভনরের স্মৃতিচিহ্নগুলি (memorial hatchments) এবং তাঁদের সপত্নীক তৈলচিত্র সহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক জিনিসপত্র কলকাতার বিশপের উদ্যোগে নেদারল্যাণ্ডসের রাজধানী আমস্টারডামের জাতীয় জাদুঘর Rijksmuseum-এ স্থানান্তরিত করা হয়ে গেছিল।
যাইহোক তৎকালীন রাজ্য সরকার এই চার্চবাড়িটিকে কোনমতে সংস্কার করে মহসীন কলেজকে তাদের জীবনবিজ্ঞান ল্যাব হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়। এই সংস্কারের ফলে চার্চের গায়ে থাকা বিভিন্ন লেখাগুলি প্রায় পুরোপুরি মুছে যায়। ১৯৭০-এ বাংলায় ছাত্র আন্দোলন শুরু হলে এই বাড়িটি আস্তে আস্তে অব্যবহারে একটি পোড়ো বাড়িতে পরিণত হয়। সময়ের সাথে সাথে এই চার্চবাড়ির লোহার বিম, জানলা-দরজার রঙবেরঙের কাঁচ এবং অন্যান্য অনেক নিদর্শন চুরি হয়ে যায়। এই সময় সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে এই বাড়িটি ভেঙ্গে এই জায়গায় মহসীন কলেজের আইন বিভাগের কলেজ গড়ে তোলা হবে। ১৯৮০ সালে এই চার্চবাড়ি ভাঙ্গার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চুঁচুড়ার এক ভদ্রলোক - হৃদয় রঞ্জন হালদার কলকাতা হাই কোর্টে মামলা ঠোকেন। এর স্বপক্ষে থাকার জন্য চুঁচুড়ার খ্রিশ্চান সম্প্রদায় এবং ভারতের সব পাদ্রীকে চিঠিও লিখে থাকেন। কিন্তু এই 'কে এক' হালদার বাবুকে কেউ বিশেষ পাত্তাও দেননি। ফলে পুরো ব্যাপারটি হয়ে গেল, একা কুম্ভ রক্ষা করে নকল বুঁদিগড়। পয়সাকড়িরও সমস্যা ছিল, বৃদ্ধ হালদারবাবুও চুঁচুড়া থেকে কলকাতায় নিয়মিত যেতে পারছিলেন না। ফলে কোর্টের রায় এলো সরকারের অনুকূলেই, ভাঙ্গা শুরু হল চুঁচুড়ার ডাচ চার্চটি। ১৯৮৮ সালে নেদারল্যাণ্ডস দূতাবাস থেকে কিছু খোঁজ খবর নেওয়া হয়েছিল, যে আর্থিক সাহায্য করে চার্চটিকে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায় কিনা। দূতাবাস থেকে ফার্স্ট সেক্রেটারি এসে দেখলেন কিছু দেওয়াল ছাড়া চার্চবাড়িটির আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সবথেকে দুঃখের ব্যাপার হল এই চূড়াসহ ঘন্টাটি এতদিন চার্চের পাশের জমিতেই পড়েছিল, চার্চ ভাঙ্গার পর সেটির হদিশ আর পাওয়া যায়নি। সম্ভবত এই ভাঙ্গাচোরার পর সেটি বিক্রি হয়ে যায় এবং গলিয়ে ফেলা হয়।
2009 সালে এই জায়গায় একটি সার্কিট হাউস গড়ে তোলা হয়। বলা বাহুল্য মহসীন কলেজের আইন বিভাগের বাড়িটি আর বানানোই হয়নি। 2017 সালে নেদারল্যাণ্ডসের দূতাবাস এবং স্থানীয় প্রশাসনের তরফে একটি স্মৃতিস্মারক গির্জা বানানো হবে বলে চিন্তাভাবনা করা হয়েছিল। আজ প্রায় ৯ বছর হয়ে গেছে সেই ভাবনা কাগজেই রয়ে গেছে।
![]() |
| আজকে ঘণ্টাঘাট - ডানদিকে দূরে দেখা যাচ্ছে, আর ওলন্দাজ গির্জার জায়গায় গড়ে উঠেছে হুগলির সার্কিট হাউস |
এতো গেল ঘণ্টাঘাটের গির্জার গল্প। আর এই ঘাট ? - এই চার্চ বানানোর অনেক আগেই ১৭২৫ সালে এই স্নানের ঘাটটি বানিয়ে দেন স্থানীয় ধনী ব্যবসায়ী নৃসিংহ দাস মল্লিক। ছোট জগন্নাথ বাড়িটিও তাঁরই বানানো।
তবে আজও ঘন্টাঘাট তার নামটি ধরে রেখেছে, বিকেল সন্ধ্যেতে শহরের মানুষজন এসে গঙ্গার হাওয়া খান, আড্ডায় মজেন। অবশ্য তাদের ক'জন বা এই ঘাটের গৌরবময় অতীত সম্পর্কে জানেন?
তথ্যসূত্রঃ
https://www.peepultree.world/livehistoryindia/story/amazing-india/ghantaghar-church-chinsurah
https://talesofhomeland.blogspot.com/2021/09/ghantaghar-lost-church-of-chinsurah.html




No comments:
Post a Comment