সত্যি কথা বলতে শ্রীরামপুর বা ফ্রেডরিকনগরের ইতিহাস নিয়ে হঠাৎ করে এই উৎসাহের পিছনে সবথেকে বড় কারণ এই সংস্কারের পরে ডেনমার্ক ট্যাভার্নের নতুন করে চালু হওয়া। ১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ট্যাভার্ন আবার পথচলা শুরু করে ২০১৮ সালে।
'Tavern' শব্দটি এসেছে পুরোনো French word 'taverne' থেকে, যার উৎপত্তি কিন্তু ল্যাটিন শব্দ 'taverna' - যার মানে দাঁড়ায় একঘরবিশিষ্ট দোকান।
ভারতের সবথেকে প্রাচীন সরাইখানা বোধহয় এই ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। বছর কয়েক আগেও এই সরাইখানা ছিল গঙ্গার ধারে একটি ভাঙ্গা বাড়ি, কেউ এই বাড়িটি নিয়ে ভাবেনি, এর ইতিহাসও কেউ খুঁজে দেখেনি। ২০১০ সালে 'শ্রীরামপুর ইনিশিয়েটিভ' এর মাধ্যমে এই ভাঙ্গা বাড়ির ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। তারপর ২০১৫ সাল থেকে ড্যানিশ মিউজিয়মের উদ্যোগে একে সাজিয়ে তোলার কাজ শুরু হয়।
১৭৮৬ সালে নিশান ঘাটের একদম পাশে এক ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জেমস পার এই সরাইখানাটি শুরু করেন। Calcutta Gazette-এ ১৬ মার্চ, ১৭৮৬ সালে এই ডেনমার্ক ট্যাভার্ন-এর উদ্ধোধনী বিজ্ঞাপন বেরিয়েছিলঃ ''Gentlemen passing up and down the river may be accommodated with breakfast, dinner, supper and lodging; also liquors sold by the single dozen and a good billiard table and coffee room with the newspapers.''
গঙ্গার ধারে বসে ফুরেফুরে হাওয়া খেতে খেতে সন্ধ্যেবেলার চা, কফি বা মদ্য পান, একটু আধটু খবরের কাগজ পড়া বা তাস পিটানো বা বিলিয়ার্ডস খেলা, সাথে অতি উৎকৃষ্ট মানের ইউরোপীয় খাওয়া দাওয়া এবং নদীমুখী বড় বড় থাকার ঘর - সব মিলিয়ে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন ছিল সেই সময়ের ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের কাছে একটি দারুণ 'Package'। তবে শুরু থেকেই Tavern এর clientele ছিল exclusively European। খরচাও হত বেশ। তবে সমসাময়িক উচ্চবিত্ত বা উচ্চপদস্থ ভারতীয়রা এখানে এসে খাওয়া-দাওয়া করেছেন সেরকম কোন খবর পাওয়া যায় না।
প্রায় বছর দুই বাদে ডেনমার্ক ট্যাভার্ন-এর আরেকটি বিজ্ঞাপন বের হয়, তা থেকে জানা যায় জেমস পার এই ট্যাভার্নটিকে জন নিকোলাসের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন। জন নিকোলাস এর আগে কলকাতার হারমোনিক ট্যাভার্ন চালিয়েছেন বলে জানা যায়। সেই বিজ্ঞাপনে বলা হলঃ
❝The gentlemen of cantonments, or parties going up and down the river, and all others who may honour Mr. Nichols with their countenance, may depend on the utmost civility and every endeavour to give satisfaction and very moderate charges. Bed, lodging, and Board, the by the week or month.❞
এক সময়ে হুগলী নদী ঘিরে ইংরেজদের দাপট বাড়তে থাকে। ১৮৪৫ সালে ড্যানিশরা শ্রীরামপুর ছেড়ে চলে যায়। এক সময়ের দাপুটে সরাইখানা বন্ধ হয়ে যায়, মাঝে পুলিশ কয়েকদিন এই বাড়িটিকে ব্যবহার করলেও শেষমেষ পরিত্যক্ত হয়, সময় গ্রাস করে বাড়িটিকে - দেওয়াল ভেঙ্গে চুরে বট-অশ্বত্থ-আগাছা গজিয়ে ওঠে, জানলা-দরজা-আসবাব-রান্নার সরঞ্জাম সব চুরি হয়ে গেছিল। নেশার ঠেকে পরিণত হয় জায়গাটি আর অন্য সময় সাপ-বেজি-পোকামাকড়ের আস্তানা। আস্তে আস্তে মানুষের স্মৃতি থেকেই উঠে গেছিল যে এই বাড়িটি কি ছিল।
২০১০ সালে ভারতে ড্যানিশদের ঔপনিবেশিক ইতিহাস খুঁজতে এসে Simon Rasten-এর নেতৃত্বে National Museum of Denmark-এর সদস্যরা অনেক খুঁজে, পুরোনো ছবি ঘেঁটে বুঝতে পারেন যে ড্যানিশদের ফেরিঘাট, আড়তঘর, গভর্নর হাউসের কাছে, ব্যারাকপুরের ঠিক উলটো দিকে গঙ্গার ধারে এই পরিত্যক্ত, ভগ্নপ্রায় বাড়িটি আসলে দেশের প্রাচীনতম হোটেল ডেনমার্ক ট্যাভার্ন। ২০১৩-এর পর থেকে একে সংস্কারের কাজ শুরু হয়। তবে এই কাজ মোটেও সহজ ছিল না। মূল কাঠামোও ভেঙ্গে পড়েছিল। পুরোনো ছবি দেখে প্রথমে বাড়িটির প্ল্যান তৈরি করা হয়। তারপর কাজে হাত দেওয়া - চুন-সুরকির কাজ করার লোক এখন দুষ্কর। কাঁচামাল থেকে কর্মী সব-ই খুব বেছে বেছে নিয়ে কাজ শুরু হয় ট্যাভার্নের পুনঃজন্মের।
Architect মনীশ চক্রবর্তী, এবং ডেনমার্কের National Museum-এর Serampore Initiative-এর প্রকল্প প্রধান Bente Wolff ছিলেন এই সংস্কার কাজের মূল মাথা। প্রসঙ্গত ২০১৬ সালে সেণ্ট ওলাভস চার্চের সংস্কার কাজের জন্য মনীশ চক্রবর্তী পেয়েছিলেন UNESCO Asia Pacific Heritage Ward।
![]() |
| সংস্কারের কাজ চলছিল যখন |
৫ কোটি খরচ করে আক্ষরিক অর্থেই ট্যাভার্ন-এর পুন:জন্ম হয়। এই খরচার বেশিরভাগটাই দিয়েছেন Realdania - ডেনমার্কের একটি বেসরকারি সংস্থা যারা মূলত স্থাপত্য সংস্কারের ক্ষেত্রে জনহিতকর প্রকল্পগুলিকে সাহায্য করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হেরিটেজ কমিশন এবং পর্যটন দপ্তরও কিছু ব্যয়ভার বহন করে। ট্যাভার্নের ভিতরের অন্তঃসজ্জা এবং বিদ্যুতের কাজে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ব্যয় হয় প্রায় এক লাখ বারো হাজার ইউরো (প্রায় ১ কোটি টাকা)। শেষমেষ ২০১৮ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি এই ট্যাভার্নের পুনঃউদ্ধোধন হয়। সেই জমকালো অনুষ্ঠানে এসেছিলেন ডেনমার্ক তো বটেই, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যাণ্ড, আইসল্যাণ্ড-এর রাষ্ট্রদূতেরা। আর ভেঙ্গে পড়েছিল পুরো শহর।
প্রথমে কয়েকদিন ট্যাভার্নটি চালিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দপ্তর, পরে এই দায়িত্ব নেয় কলকাতার Apeejay Surrendra Group পরিচালিত দেশের নামজাদা হোটেল chain - Park Hotels। এখন ডেনমার্ক ট্রাভর্নের মূল আকর্ষণ এদের রেস্তোঁরাটি।
সাথে আছে ৬টি থাকার ঘর - The Harbour Suite, The River Breeze Suite, The Veranda Suite, The Green Shuttered Suite, The Hooghly Suite, The Mango Tree Suite। এবং একটি ফ্লুরিস কাফে।
![]() |
| The Hooghly Suite (Photo Credit: The Park Hotels) |
![]() |
| The Green Shattered Suite (Credit: The Park Hotels) |
![]() |
| The River Breeze Suite (Credit: The Park Hotels) |
ডেনমার্ক ট্রাভর্নের রেস্তোঁরাটি খোলা থাকে দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা অবধি। কলকাতার হিসেবে রাত ৯টা সন্ধ্যে বলে মনে হলেও শ্রীরামপুর শহরের হিসেবে, এবং রেলস্টেশন থেকে প্রায় কিলোমিটার খানেক দূরে গঙ্গার ধারে খুব একটা ভিড় হয় না। এছাড়া আছে পার্ক হোটেলের দাম যা এই শহরতলির হিসেবে একটু বেশিই, আর এখানকার ড্যানিশ ক্যুইজিন স্থানীয় মানুষজনের জিভে অতটাও আহামরি লাগেনি।
![]() |
| Danish Tavern - today |
![]() |
| Danish Tavern - Outside view |
![]() |
| Danish Tavern - outside look |
![]() |
| Denmark Tavern - Main Dining Hall |
![]() |
| Denmark Tavern - Main Dining Hall |
এখন আসি ডেনমার্ক ট্যাভার্নের খাওয়া দাওয়ার কথায়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই রেস্তরাঁর মেনুতে আছে টোস্ট, স্যাণ্ডউইচ, স্যুপ, স্ন্যাক্স এবং লাইট মিল, ইটালিয়ান পাস্তা এবং পিজ্জা, চাইনিজ নুড্যলস, ফ্রাইড রাইস, নর্থ ইণ্ডিয়ান ডিস, তন্দুরি, বিরিয়ানি। বাঙ্গালি খাবারের মধ্যে পাবেন আলুর দম, ছোলার ডাল, চিকেন কারি, মাটন কষা, সাদা ভাত, লুচি, রুটি এবং পরোটা। এছাড়া ড্যানিশ স্পেশাল কিছু খাবার, যেমন Danish Style Chicken Sausage, Danish Style Roast Chicken, Grilled Fish with Fries & Lemon Butter Sauce, Fish Fry এবং ড্যানিশ পেস্ট্রি (আইসক্রিম সহযোগে)ও এখানে পাওয়া যায়। বার-মেনু অবশ্য এখানে সংক্ষিপ্ত - অল্প কিছু সীমিত বিয়ার, হুইস্কি এবং ভদকা পাওয়া যায়।
The official website: https://www.theparkhotels.com/the-denmark-tavern
Sources:
https://en.natmus.dk/historical-knowledge/historical-knowledge-the-world/asia/india/the-history-of-serampore/denmark-tavern/
https://www.thehindu.com/news/cities/kolkata/232-year-old-denmark-tavern-opens-doors-again/article22891066.ece
#Serampore #DenmarkTavern #HeritageRestaurant #RestoredRestaurant #TheTavernbyThePark #HooghlyHeritage #DanishinIndia #WestBengalHeritage #IncredibleIndia





















No comments:
Post a Comment